ত্রিপুরা টিভি | যশপাল সিং, ত্রিপুরা, ৬ই ডিসেম্বর: ত্রিপুরার খোয়াই—যে শহর একসময় সংস্কৃতি, শিল্পচর্চা, সাহিত্য সাধনা ও শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল—আজ গভীর সংকটে। নেশা, মাদক ব্যবসা, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও আইনের অপব্যবহারের সমন্বয়ে তৈরী হয়েছে এক ভয়ঙ্কর চক্র, যার কবলে হারাচ্ছে খোয়াইয়ের ঐতিহ্য ও সামাজিক সুস্থতা। স্থানীয়দের বক্তব্য, এখানে এখন আর আইন শক্তিশালী নয়—বরং মাদক কারবারীদের হাতই লম্বা হয়ে পড়েছে।
পুলিশ প্রশাসন সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, বিশেষ অভিযানে সাফল্যও এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে—এই সাফল্য কি টেকসই? কারণ অভিযোগ অনুযায়ী একই নেশাকারবারীকে ৫-৬ বার গ্রেফতার করা হলেও, সহজেই জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছে। জনমতের একাংশের অভিযোগ—কিছু আইনজীবী পেশাগত দায়িত্বের আড়ালে আইনের ফাঁকে এমন সুযোগ করে দিচ্ছেন, যা সমাজের জন্য ভয়াবহ ক্ষতি ডেকে আনছে। ফলে খোয়াই বারবার নেশামুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেও মুক্ত হতে পারছে না।
অন্যদিকে, খোয়াই পুলিশ প্রশাসনের মধ্যেই যেন অদৃশ্য বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে। সাদা পোশাকের স্পেশাল টিম এবং কর্তব্যরত পুলিশের মধ্যে ভেদাভেদ তৈরির অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ মানুষের ক্ষোভ—এই কৃত্রিম বিভাজন পরিকল্পিতভাবে তৈরি করে প্রশাসনিক কার্যকারিতা ব্যাহত করা হচ্ছে, যাতে মাদকচক্রের সুবিধা হয়।
খোয়াইয়ের একসময়ের প্রাণবন্ত অঞ্চল—সুভাষপার্ক, কোহিনুর মার্কেট, বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চত্বর—এখন নেশাখোর, মাদক ট্যাবলেট সেবী এবং জুয়ারীদের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠছে। অভিযোগ অনুযায়ী দায়িত্বপ্রাপ্তরা যথাসময়ে হস্তক্ষেপ করতে ব্যর্থ। এমনকি জেলা হাসপাতাল চত্বরেও নেশাগ্রস্তদের আনাগোনা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধকে নষ্ট করছে।
স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়েও ক্ষোভ দানা বাঁধছে। স্থানীয়দের দাবি, জেলা হাসপাতাল নোংরা, অগোছালো ও অব্যবস্থাপনায় জর্জরিত। জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা দুর্বল। তার ওপর এমএস সাহেবের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তিনি অফিসের প্রশাসনিক দায়িত্ব এড়িয়ে ইন্ডোর ও আউটডোরে রোগী দেখতেই বেশি সময় ব্যয় করছেন, ফলে প্রশাসনিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। অন্য চিকিৎসকেরা অসন্তুষ্ট হলেও চাপের মুখে কথা বলতে সাহস পাচ্ছেন না।
একদিকে হাসপাতাল চত্বরে নেশা-চক্রের অবাধ দখল, অন্যদিকে প্রশাসনিক অকার্যকারিতা—এই দুই মিলে মানুষের ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে। স্থানীয়দের হাহাকার—যারা সমাজকে নৈতিকতার পাঠ দিচ্ছেন, তারাই নিজের কর্মক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন না।
আজ খোয়াইবাসীর দাবি একটাই—শহরকে বাঁচাতে দায়িত্ববানদের সত্যিকারের দায়িত্ব পালন করতে হবে। মুখে প্রতিশ্রুতি নয়, প্রয়োজন দৃঢ় পদক্ষেপ; পুলিশের ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ; আইনের যথাযথ প্রয়োগ; প্রশাসনিক সততা; এবং সমাজের সম্মিলিত সচেতনতা।
খোয়াইকে আবার তার সুদিনে ফিরিয়ে আনতে হলে মাদকচক্রকে রক্ষা নয়, নির্মূল করতে হবে। সময় এখনই—কারণ শহর যদি আরেকটু পিছলে যায়, তাহলে হয়তো ফেরানোর আর কোনো সুযোগই বাকি থাকবে না।
Leave a Comment