---Advertisement---

ত্রিপুরার গর্ব ‘ত্রিপুরা সারিন্দা’ পেল GI Tag, বিশ্বমঞ্চে নতুন পরিচিতি!

By Suman Debnath

June 16, 2026 8:00 PM

---Advertisement---

যশপাল সিং, ত্রিপুরা: ত্রিপুরার সমৃদ্ধ জনজাতি সংস্কৃতি, লোকঐতিহ্য এবং প্রাচীন সঙ্গীতচর্চার ইতিহাসে যুক্ত হলো এক নতুন গৌরবময় অধ্যায়। রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী তন্ত্রী বাদ্যযন্ত্র ‘ত্রিপুরা সারিন্দা’ আনুষ্ঠানিকভাবে ভৌগোলিক নির্দেশক (Geographical Indication বা GI) ট্যাগ লাভ করেছে। এই স্বীকৃতি শুধু একটি বাদ্যযন্ত্রের মর্যাদা বৃদ্ধি নয়, বরং ত্রিপুরার মূলবাসী ও উপজাতি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয়, সৃজনশীলতা এবং শতাব্দীপ্রাচীন ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

ত্রিপুরার বিভিন্ন জনজাতি সম্প্রদায়ের সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে সারিন্দার ব্যবহার হয়ে আসছে। উৎসব, লোকগান, আচার-অনুষ্ঠান এবং ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় এই বাদ্যযন্ত্রের সুর বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে স্থানীয় কারিগররা নিজেদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে হাতে তৈরি করে আসছেন এই অনন্য বাদ্যযন্ত্র। কাঠ, প্রাকৃতিক উপাদান এবং সূক্ষ্ম কারুকার্যের সমন্বয়ে নির্মিত ত্রিপুরা সারিন্দা শুধু একটি বাদ্যযন্ত্র নয়, এটি রাজ্যের লোকজ সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতীক।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জিআই ট্যাগ পাওয়ার ফলে ‘ত্রিপুরা সারিন্দা’র মৌলিকতা এবং স্বকীয়তা আইনগতভাবে সুরক্ষিত থাকবে। ফলে অন্য কোনো অঞ্চল বা প্রতিষ্ঠান এই নাম ব্যবহার করে অনুকরণমূলক পণ্য বাজারজাত করতে পারবে না। এর মাধ্যমে প্রকৃত নির্মাতা ও শিল্পীদের অধিকার নিশ্চিত হবে এবং তাঁদের তৈরি পণ্যের প্রতি ক্রেতাদের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে।

আরও পড়ুন:  মোদির ১২ বছরের নেতৃত্বে বিশ্বমঞ্চে ভারতের মর্যাদা বেড়েছে: মুখ্যমন্ত্রী মানিক সাহা!

সাংস্কৃতিক মহলের অভিমত, এই স্বীকৃতি ত্রিপুরার হারিয়ে যেতে বসা বহু লোকঐতিহ্যকে নতুন করে আলোচনায় নিয়ে আসবে। একই সঙ্গে দেশ-বিদেশে গবেষক, সংস্কৃতিপ্রেমী এবং সঙ্গীত অনুরাগীদের মধ্যে ত্রিপুরার ঐতিহ্যবাহী সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্র সম্পর্কে আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। পর্যটন শিল্পের ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করা হচ্ছে। রাজ্যের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ঘিরে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই জিআই স্বীকৃতির ফলে সারিন্দা নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় কারিগর ও শিল্পীদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে পরিচিতি বাড়লে চাহিদাও বৃদ্ধি পাবে, যার সরাসরি সুফল পাবেন এই ঐতিহ্য রক্ষায় নিয়োজিত পরিবারগুলো। বহু ক্ষেত্রে বিলুপ্তির মুখে থাকা লোকশিল্প নতুন প্রাণ ফিরে পাবে এবং তরুণ প্রজন্মও এই শিল্পের প্রতি আকৃষ্ট হবে।

উল্লেখ্য, ‘ত্রিপুরা সারিন্দা’ জিআই ট্যাগ পাওয়ার পর বর্তমানে ত্রিপুরার মোট চারটি ঐতিহ্যবাহী পণ্য ও সামগ্রী এই মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি অর্জন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ত্রিপুরা কুইন আনারস, যা তার অনন্য স্বাদ, গন্ধ এবং গুণগত মানের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত; রিসা, যা জনজাতি নারীদের ঐতিহ্যবাহী হাতবোনা বস্ত্র; পাছরা বা রিগ্নাই, যা ত্রিপুরার উপজাতি সমাজের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম প্রতীক; এবং সর্বশেষ সংযোজন ত্রিপুরা সারিন্দা, যা রাজ্যের প্রাচীন সঙ্গীত ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক।

আরও পড়ুন:  তেলিয়ামুড়ায় গ্যাস সিলিন্ডার চুরি চক্রে ধাক্কা, দুই যুবক গ্রেপ্তার; বড়সড় নেটওয়ার্কের সন্ধানে পুলিশ!

এছাড়াও, ত্রিপুরার সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম মাতাবাড়ির পেড়া, যা উদয়পুরের বিখ্যাত ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরের প্রসাদ হিসেবে সুপরিচিত এবং ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত পরিচিতি লাভের সম্ভাবনা রয়েছে।

‘ত্রিপুরা সারিন্দা’র এই জিআই স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে রাজ্যের জন্য এক ঐতিহাসিক অর্জন। এটি শুধু একটি বাদ্যযন্ত্রের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নয়, বরং ত্রিপুরার জনজাতি সমাজের সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়, সৃজনশীল ঐতিহ্য এবং ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের বিশ্বমঞ্চে পুনঃপ্রতিষ্ঠা। এই সাফল্যে রাজ্যের শিল্পী, কারিগর, সংস্কৃতিপ্রেমী এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে উৎসবের আবহ সৃষ্টি হয়েছে। তাঁদের প্রত্যাশা, এই স্বীকৃতির মাধ্যমে ত্রিপুরার লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আগামী দিনে আরও ব্যাপকভাবে বিশ্বদরবারে পৌঁছে যাবে এবং রাজ্যের সাংস্কৃতিক ঐশ্বর্য নতুন উচ্চতায় উন্নীত হবে।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment