স্কুলের ক্লাসঘর ছেড়ে ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজে শিক্ষকদের জোর করে টেনে আনার অভিযোগে এবার সরাসরি নির্বাচন কমিশনকে (Election Commission of India) কাঠগড়ায় তুলল দিল্লি হাইকোর্ট (Delhi High Court)। প্রশ্ন একটাই, সংবিধানের ৩২৪ নম্বর ধারার (Article 324) আড়ালে দাঁড়িয়ে কি ইচ্ছেমতো যা খুশি করতে পারে কমিশন?
আদালতের প্রশ্নবাণ
শুক্রবার প্রধান বিচারপতি দেবেন্দ্র কুমার উপাধ্যায় এবং বিচারপতি তেজস কারিয়ার ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট ভাষায় জিজ্ঞাসা করে, আর্টিকল ৩২৪-এর ছায়ায় দাঁড়িয়ে যা খুশি করার অধিকার কি সত্যিই কমিশনের রয়েছে। রাজধানীতে বিশেষ নিবিড় পুনর্বিক্ষণ বা এসআইআরের (Special Intensive Revision, SIR) কাজে সরকারি স্কুলশিক্ষকদের বুথ স্তরের আধিকারিক (Booth Level Officer, BLO) হিসেবে ব্যাপক হারে নিয়োগ করা নিয়েই দায়ের হয়েছিল জনস্বার্থ মামলা। আদালতের পর্যবেক্ষণ, শিক্ষকদের স্বেচ্ছাসেবক বলা হলেও বাস্তবে তাঁদের হাতে কাজ প্রত্যাখ্যানের কোনও সুযোগই নেই। কমিশনের তরফে আইনজীবী সঞ্জয় বশিষ্ঠ জানান, দিল্লিতে এসআইআর প্রক্রিয়া প্রায় শেষের মুখে এবং মোট শিক্ষকদের মাত্র ১০ থেকে ১৪ শতাংশকেই শেষ পর্যন্ত এই কাজে ডাকা হয়।
ছুটির দিন নেই
কমিশনের দাবি, শিক্ষকদের শুধু ছুটির দিনে বা পঠনপাঠনের বাইরের সময়ে বিএলও-র কাজ করতে বলা হয়। কিন্তু আদালতের পাল্টা প্রশ্ন, একজন সাধারণ সরকারি কর্মীর মতো শিক্ষকদেরও তো সাপ্তাহিক ছুটির অধিকার আছে, তা হলে কেন তাঁদেরই বারবার সেই ছুটি বিসর্জন দিতে হবে। সাম্মানিক দিয়ে যদি কাজটা সত্যিই স্বেচ্ছামূলক হয়, তা হলে সরাসরি হলফনামায় সে কথা লিখে দিতে বলে আদালত। মামলাকারী আইনজীবী রাজেশ কুমার গোগনা ও অশোক আগরওয়ালের অভিযোগ, গোটা শিক্ষাবর্ষ জুড়ে বহু সরকারি ও পুরসভা-পরিচালিত স্কুলে গোটা শিক্ষকমণ্ডলীকেই ভোটের কাজে টেনে নেওয়া হয়েছে, ফলে ক্লাস চালাতে হচ্ছে অতিথি শিক্ষক বা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকদের দিয়ে। আদালত কমিশনকে হলফনামা জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে।
বাংলায় একই লড়াই
দিল্লির এই লড়াই আসলে অচেনা নয় বাংলার (West Bengal) কাছে। রাজ্যেও ২০০২ সালের পর ফের এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকেই একই অভিযোগে সরব হয়েছেন রাজ্যের বহু স্কুলশিক্ষক। বহু ক্ষেত্রে অভিযোগ ওঠে, সকালে নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার পর দুপুরে ফের বিএলও-র দায়িত্ব সামলাতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা, যার ফলে এনিউমারেশন ফর্ম সংগ্রহ ও তা আপলোডের কাজেও দেরি হচ্ছে। মুর্শিদাবাদের বহরমপুরের এক শিক্ষক মহম্মদ কাইসার রশিদ তো সরাসরি জেলাশাসকের কাছে চিঠি লিখে ব্যক্তিগত ও সামাজিক দায়িত্বের কারণে জটিল এই দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়েছিলেন।
মাধ্যমিক পরীক্ষার (Madhyamik Pariksha) মরসুমেও একই সমস্যা মাথাচাড়া দিয়েছিল রাজ্যে। পশ্চিমবঙ্গ মধ্যশিক্ষা পর্ষদ রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (Chief Electoral Officer) কাছে আবেদন জানিয়েছিল, পরীক্ষার দিনগুলিতে অন্তত বিকেল সাড়ে চারটে পর্যন্ত শিক্ষকদের বিএলও দায়িত্ব থেকে রেহাই দেওয়া হোক। সেই আবেদনে সরাসরি উদ্ধৃত হয়েছিল কলকাতা হাইকোর্টের (Calcutta High Court) একটি পুরনো নির্দেশও, যেখানে বলা হয়েছিল, ছুটির দিন বা পঠনপাঠনহীন সময়েই শুধু শিক্ষকদের এই কাজে ব্যবহার করা উচিত, যাতে পঠনপাঠনে বিঘ্ন না ঘটে।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে গোটা রাজ্যেই ভোটার তালিকা সংশোধন এমনিতেই স্পর্শকাতর বিষয়। সেই আবহে শিক্ষকদের ওপর বাড়তি চাপ শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়, প্রশাসনিক মহলেও অস্বস্তি তৈরি করেছে। দিল্লি হাইকোর্টের এই কড়া অবস্থান তাই বাংলার শিক্ষক সংগঠনগুলির কাছেও একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে, বিশেষত যেখানে একই ধরনের অভিযোগ বারবার উঠে এসেছে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।
Leave a Comment