---Advertisement---

ক্লাস টেনের গণ্ডি পেরোনো হয়নি, মোটরবোটও নেই! কাঠের নৌকায় ভর করে অসমের বন্যায় প্রায় ২ হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচালেন যুবক

By Suman Debnath

August 2, 2026 12:55 PM

ক্লাস টেনের গণ্ডি পেরোনো হয়নি, মোটরবোটও নেই! কাঠের নৌকায় ভর করে অসমের বন্যায় প্রায় ২ হাজার মানুষের প্রাণ বাঁচালেন যুবক

---Advertisement---


অসম (Assam)-এর ভয়াবহ বন্যার মধ্যে সামনে এল এক অসাধারণ মানবিকতার গল্প। মাত্র ২৫ বছরের শ্রাবণ কুমার (Shravan Kumar), যিনি দশম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি, কোনও উদ্ধারকারী বাহিনীর সদস্য নন, এমনকি তাঁর কাছে ছিল না মোটরচালিত নৌকাও। তবু নিজের নদী চেনার অভিজ্ঞতা আর একটি ঐতিহ্যবাহী কাঠের নৌকা নিয়ে তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা সিভসাগর (Sivasagar) জেলার পাঁচটি গ্রাম থেকে প্রায় ২ হাজার মানুষকে নিরাপদে উদ্ধার করেছেন। অসম বন্যার এই ঘটনাই এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

১৯ জুলাই ভোর ৩টা নাগাদ প্রতিদিনের মতো ডিখৌ নদীর (Dikhow River) তীরে গিয়েছিলেন শ্রাবণ। বর্ষাকালে নদীতে ভেসে আসা কাঠ সংগ্রহ করাই তাঁর পরিবারের আয়ের অন্যতম উৎস। পাশাপাশি রান্নার জ্বালানির জন্যও সেই কাঠের উপর নির্ভর করতে হয় তাঁদের, কারণ বাড়িতে এলপিজি সংযোগ নেই।

সেদিন নদীর আচরণ ছিল অন্যরকম। বিশাল গাছের গুঁড়ি অস্বাভাবিক গতিতে ভেসে যেতে দেখে ছোটবেলা থেকে নদীর পাশে বড় হওয়া শ্রাবণের মনে আশঙ্কা তৈরি হয়। সকাল হতেই সেই আশঙ্কা সত্যি হয়। দ্রুত বাড়তে থাকা জলে একের পর এক এলাকা প্লাবিত হতে শুরু করে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে তিনি সময় নষ্ট না করে বন্ধুদের সঙ্গে একটি ঐতিহ্যবাহী ‘তুলুঙ্গা নাও’ (Tulunga Nao) নিয়ে উদ্ধারকাজে নেমে পড়েন। প্রবল স্রোত ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির কারণে যেখানে অনেক অভিজ্ঞ মাঝিও নদীতে নামতে সাহস পাননি, সেখানে এই তরুণদের দল ঘণ্টার পর ঘণ্টা জীবন বাজি রেখে কাজ চালিয়ে যায়।

আরও পড়ুন:  শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা মোদির, আজ রাজ্যে একাধিক কর্মসূচিতে অমিত শাহ

সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া সেই উদ্ধার অভিযান চলে রাতভর এবং পরের দিনও। প্লাবিত বাড়ি থেকে শিশুদের বের করে আনা, অসুস্থ ও প্রবীণদের নিরাপদ জায়গায় পৌঁছে দেওয়া, গর্ভবতী মহিলা ও ছাদের নিচে বা সিলিংয়ের মধ্যে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধার—সব দায়িত্বই কাঁধে তুলে নেন তাঁরা।

শ্রাবণের কথায়, অনেক মানুষ বাড়ির সিলিংয়ের ভেতরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। অন্ধকার রাতে কোনও আলো ছাড়াই তাঁদের উদ্ধার করতে হয়েছে। চারদিকে ভাসমান বিশাল গাছের গুঁড়ির মধ্যে দিয়ে ছোট নৌকা চালানো ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবু একের পর এক গ্রামে পৌঁছে তাঁরা মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যান।

এই সময় তাঁর নিজের বাড়িতেও ঢুকে পড়ে বন্যার জল। মা ও ভাই বাড়ির জিনিসপত্র বাঁচানোর চেষ্টা করছিলেন। তবু তিনি বাড়ি ফেরেননি। শ্রাবণের কথায়, যদি নিজের বাড়ি বাঁচাতে ফিরে যেতেন, তাহলে অন্যদের উদ্ধার করার মতো আর কেউ থাকত না।

উদ্ধার অভিযান শেষ হওয়ার পর শ্রাবণের দাবি, তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা মিলে পাঁচটি গ্রামের প্রায় ২ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে শিশু, মহিলা, প্রবীণ এবং অসুস্থ মানুষও ছিলেন।

১৯ জুলাইয়ের এই বন্যায় সিভসাগরের নজিরা কো-ডিস্ট্রিক্ট (Nazira Co-District)-এর বিস্তীর্ণ এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে। বহু রাস্তা ভেসে যায়, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। বহু পরিবার বাধ্য হয়ে বাড়ির ছাদে আশ্রয় নেয়।

আরও পড়ুন:  ঝাড়খণ্ডে ছাত্র আন্দোলনে CJP-র সমর্থন, রাঁচিতে আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন অভিজিৎ দীপকেরা

এদিকে অসম রাজ্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (Assam State Disaster Management Authority-ASDMA)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যে বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখনও প্রায় ১.৭৮ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত। গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন কোনও মৃত্যুর খবর মেলেনি। ফলে বন্যাজনিত মোট মৃতের সংখ্যা ৮২-তেই স্থির রয়েছে।

ডিখৌ নদী সিভসাগরে এবং ধানসিরি নদী (Dhansiri River) গোলাঘাট (Golaghat)-এর নুমালীগড় এলাকায় এখনও বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে। বর্তমানে গোলাঘাট, সিভসাগর, চরাইদেও (Charaideo), বাজালি (Bajali), ধেমাজি (Dhemaji), শোণিতপুর (Sonitpur) ও জোরহাট (Jorhat)-সহ সাতটি জেলার ৩৪৯টি গ্রাম বন্যার কবলে রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চরাইদেও, যেখানে ৭৫ হাজারেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সিভসাগরে সেই সংখ্যা প্রায় ৫৯ হাজার।

রাজ্যে বর্তমানে ৪৪টি ত্রাণ শিবিরে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। পাশাপাশি ১৭টি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র থেকে কয়েক হাজার মানুষের কাছে জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যেও শ্রাবণ কুমারের সাহসিকতা ও মানবিক উদ্যোগ এখন অসমের মানুষের কাছে এক অনুপ্রেরণার প্রতীক হয়ে উঠেছে।

সবচেয়ে আগে সঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে

Google News এবং Google Discover Google Discover -এ নজরবন্দি-কে Follow করে রাখুন।

---Advertisement---

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment