১৯৯৩ সালের ২১ জুলাইয়ের বহুচর্চিত গুলিকাণ্ড নিয়ে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে প্রকাশ্যে না-আসা তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট অবশেষে বিধানসভায় পেশ করল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ৩৩তম ২১ জুলাইয়ের প্রাক্কালে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) রিপোর্ট তুলে ধরে দাবি করেন, পুলিশের গুলিচালনার যথার্থতা কমিশন খুঁজে পায়নি এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্ত (Manish Gupta)-র নির্দেশেই গুলি চালানো হয়েছিল। তাঁর আরও অভিযোগ, ঘটনার অন্যতম প্রধান সাক্ষী হওয়ার কথা থাকলেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)-কে কমিশন সাক্ষ্য দেওয়ার জন্যই ডাকে নি।
১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই সচিত্র ভোটার পরিচয়পত্রের দাবিতে তৎকালীন যুব কংগ্রেসের ডাকা মহাকরণ অভিযানের সময় কলকাতায় (Kolkata) পুলিশের গুলিতে ১৩ জন কর্মীর মৃত্যু হয়। সেই ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই বাংলার রাজনীতির অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে এই ঘটনার বিচারবিভাগীয় তদন্তের জন্য বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় (Justice Sushanta Chattopadhyay)-এর নেতৃত্বে কমিশন গঠন করেছিল তৎকালীন তৃণমূল সরকার। কিন্তু কমিশনের রিপোর্ট এতদিন প্রকাশ্যে আনা হয়নি।
সোমবার বিধানসভায় সেই রিপোর্ট পেশ করে শুভেন্দু অধিকারী জানান, তদন্তের স্বার্থে মোট ৪৪ জনকে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য তলব করা হয়েছিল। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য (Buddhadeb Bhattacharjee) থেকে শুরু করে তৎকালীন পুলিশের একাধিক আধিকারিকও সেই তালিকায় ছিলেন। তবে রিপোর্ট অনুযায়ী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য কোনও নোটিস পাঠানো হয়নি বলেই উল্লেখ রয়েছে।
রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায় (Pankaj Banerjee)-কে সাক্ষ্য দিতে ডাকা হলেও তিনি হাজির হননি। কারণ হিসেবে তিনি কমিশনকে জানিয়েছিলেন, যাঁর বিরুদ্ধে গুলিচালনার অভিযোগ, সেই মণীশ গুপ্তকে পরবর্তী সময়ে মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হয়েছিল। সেই পরিস্থিতিতে সাক্ষ্য দেওয়া তাঁর কাছে সমীচীন বলে মনে হয়নি।
বিধানসভায় রিপোর্টের বিভিন্ন অংশ উদ্ধৃত করে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, ২১ জুলাই পুলিশের গুলিচালনার পিছনে পর্যাপ্ত যুক্তি ছিল না। কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাইটার্স বিল্ডিং (Writers’ Building)-এ হামলার আশঙ্কা দেখিয়ে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তার কোনও বাস্তব ভিত্তি পাওয়া যায়নি। মেয়ো রোড, রেড রোড এবং ডোরিনা ক্রসিংয়ের মতো বিভিন্ন এলাকায় গুলিচালনাকে কমিশন অপ্রয়োজনীয় বলেই উল্লেখ করেছে।
শুভেন্দু অধিকারীর আরও দাবি, কমিশনের রিপোর্টে মণীশ গুপ্তের নির্দেশে গুলি চালানোর কথা উল্লেখ থাকলেও তাঁকে নির্দেশ দিয়েছিলেন কে, তার নির্দিষ্ট উত্তর মেলেনি। একই সঙ্গে পুলিশের গুলিচালনাকে ন্যায্য প্রমাণ করার মতো পর্যাপ্ত তথ্যও কমিশনের সামনে উঠে আসেনি বলে রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে।
রিপোর্ট প্রকাশের পর নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, প্রতিবছর ২১ জুলাই শহিদ দিবস পালন করা হলেও কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ্যে আনা হয়নি শুধুমাত্র মণীশ গুপ্তকে রাজনৈতিকভাবে রক্ষা করার জন্য। তাঁর বক্তব্য, শহিদদের ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তৎকালীন সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি।
তবে এই অভিযোগের বিষয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে ২১ জুলাইয়ের ঐতিহাসিক গুলিকাণ্ড নিয়ে কমিশনের রিপোর্ট সামনে আসার পর নতুন করে রাজনৈতিক তরজা আরও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
Leave a Comment