যাদবপুরে বামেদের বুকস্টলে কুণাল ঘোষ! ‘বুলডোজার-প্রতিবাদে’ কিনলেন বিমান বসুকে নিয়ে লেখা বই

By Suman Debnath

October 18, 2026 3:55 PM

যাদবপুরে বামেদের বুকস্টলে কুণাল ঘোষ! ‘বুলডোজার-প্রতিবাদে’ কিনলেন বিমান বসুকে নিয়ে লেখা বই


যাদবপুরের ৮বি বাসস্ট্যান্ডে সিপিএমের বুকস্টল ঘিরে উত্তেজনার রেশ কাটতে না কাটতেই রবিবার সকালে সেখানে হাজির হলেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা তথা বিধায়ক কুণাল ঘোষ। শনিবার রাতে ওই বুকস্টল সরানোকে কেন্দ্র করে পুলিশ ও বাম কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়েছিল। অভিযোগ, স্টলটি ভেঙে সরিয়ে দিতে বুলডোজার নিয়ে হাজির হয়েছিল পুলিশ। সেই ঘটনার প্রতিবাদ জানাতেই এদিন বামেদের বুকস্টলে গিয়ে বই কিনলেন কুণাল। আর তাঁর এই উপস্থিতিকে ঘিরেই রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা।

চোরবাগানের পুজো মণ্ডপে পদপিষ্টের ঘটনায় যখন পুলিশি ভূমিকা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে, তখন যাদবপুরের বুকস্টল-কাণ্ডও নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে। বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, বামেদের বই বিক্রির অধিকার নিয়ে আগেই সরব হয়েছিলেন কুণাল ঘোষ। তিনি জানিয়েছিলেন, অতীতেও বামেদের স্টল থেকে বই কিনেছেন, ভবিষ্যতেও কিনবেন। রবিবারের ঘটনাকে সেই অবস্থানেরই বাস্তব প্রতিফলন বলে মনে করছেন অনেকে।

‘প্রতিবাদ স্বরূপ উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতায় এসে কিনলাম’

রবিবার যাদবপুরের ৮বি বাসস্ট্যান্ডের বুকস্টলে গিয়ে কুণাল ঘোষ জানান, প্রতি বছরই তিনি সেখানে আসেন। তবে মাঝে কয়েক বছর আসা হয়নি। তাঁর কথায়, এই স্টলে মার্কসবাদী সাহিত্যের পাশাপাশি সাধারণ সাহিত্যও পাওয়া যায়।

কুণাল বলেন, “প্রতি বছর এখানে আসি। তবে মাঝে কয়েক বছর এই স্টলে আসতে পারিনি। আসলে এই স্টলে মার্কসবাদী সাহিত্যের পাশাপাশি সাধারণ সাহিত্যের সংকলনও থাকে।”

বুকস্টল সরাতে বুলডোজার নিয়ে পুলিশের অভিযানের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, সিপিএমের রাজ্য কমিটির সদস্য সুদীপ সেনগুপ্ত তাঁর বন্ধু। বিমান বসুকে নিয়ে প্রকাশিত ‘আমাদের চেয়ারম্যান’ বইটি সংগ্রহ করার ইচ্ছা ছিল তাঁর। নিজের এলাকার কোনও বুকস্টল থেকেও বইটি কিনতে পারতেন। কিন্তু যাদবপুরের স্টলে এসে বই কেনার পিছনে প্রতিবাদের বার্তাও রয়েছে বলে স্পষ্ট করেন তিনি।

কুণালের কথায়, “আমার ইচ্ছা ছিল বিমান বসুকে নিয়ে যে বই প্রকাশ হয়েছে, ‘আমাদের চেয়ারম্যান’, সেটা সংগ্রহ করার। সেটা হয়তো আমি আমার পাড়ার স্টল থেকে কিনে নিতে পারতাম, কিন্তু প্রতিবাদ স্বরূপ উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতায় এসে কিনলাম।”

আরও পড়ুন:  জনগণনা এড়ালে জরিমানা এমনকি জেলও হতে পারে, স্কুলগুলিকে কড়া বার্তা পুরসভার

একই বুকস্টলে কুণাল ও শতরূপ, রাজনৈতিক মহলে চর্চা

কুণাল ঘোষ যখন বামেদের বুকস্টলে বই কিনছেন, তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন সিপিএম নেতা শতরূপ ঘোষও। রাজ্য রাজনীতিতে এই দুই নেতার মধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতোর নতুন নয়। বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁদের পরস্পরের বিরুদ্ধে সরব হতে দেখা গিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের সামনে একাধিকবার দু’পক্ষের তীব্র বাক্য বিনিময়ও হয়েছে।

সেই পরিস্থিতিতে একই বুকস্টলে কুণাল ও শতরূপের উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই নজর কেড়েছে। যদিও এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দলের রাজনৈতিক অবস্থানে কোনও পরিবর্তন হয়েছে, এমনটা নিশ্চিতভাবে বলার সুযোগ নেই। তবে বামেদের বই বিক্রির অধিকার নিয়ে তৃণমূলের এক বিধায়কের প্রকাশ্যে পাশে দাঁড়ানো রাজনৈতিক মহলে আলোচনার নতুন বিষয় হয়ে উঠেছে।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের পর রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে কোনও পরিবর্তন হচ্ছে কি না, তা নিয়েও নানা মহলে আলোচনা চলছে। যাদবপুরের এই ঘটনা সেই জল্পনাকে আরও উসকে দিয়েছে।

কী নিয়ে শুরু হয়েছিল বুকস্টল-কাণ্ড?

বাম কর্মী ও ছাত্র-যুব সংগঠনগুলির অভিযোগ, কোনও পূর্ব নোটিস না দিয়েই শনিবার যাদবপুরের ৮বি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় সিপিএমের রাজনৈতিক প্রকাশনা ও বইয়ের স্টল সরাতে পুলিশ বিশাল বাহিনী নিয়ে হাজির হয়। সঙ্গে ছিল একটি বুলডোজার।

বাম শিবিরের দাবি, প্রথম দফায় ছাত্র ও যুবকদের প্রতিরোধ এবং মানববন্ধনের মুখে পড়ে বুলডোজারটি পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু অভিযোগ, গভীর রাতে ফের অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী নিয়ে অভিযান চালানো হয় এবং বুকস্টলটি সরানোর চেষ্টা করা হয়।

অন্যদিকে, পুলিশ সূত্রের দাবি ছিল, ওই নির্দিষ্ট স্থানে বুকস্টল বসানোর জন্য সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমতি ছিল না। সেই কারণেই বেআইনি স্টল সরানোর পদক্ষেপ করা হয়েছিল।

প্রশাসনের এই পদক্ষেপ ঘিরে এলাকায় ক্ষোভ ছড়ায়। বুকস্টল রক্ষার দাবিতে সিপিএম এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (AISA)-এর কর্মী-সমর্থকেরা রাতভর দফায় দফায় জমায়েত করেন। মানববন্ধন করেও প্রতিবাদ জানান তাঁরা। বাম নেতৃত্বের দাবি, একাধিকবার পুলিশ আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। এই সময় সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের উপর লাঠিচার্জের অভিযোগও ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে।

আরও পড়ুন:  ‘অভিষেকের হাত ছেড়ে ফিরে আসুন’! ২১ জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে মমতাকে বিস্ফোরক বার্তা মদন মিত্রের

রাজ্য সরকারকে নিশানা SFI-এর

ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন ভারতের ছাত্র ফেডারেশন (SFI)-এর রাজ্য সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য। রাজ্য সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “এই রাজ্যে এখন পুরোপুরি অমানুষদের সরকার চলছে।”

বাম নেতৃত্বের বক্তব্য, রাজনৈতিক প্রকাশনা ও বইয়ের স্টলকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের এমন তৎপরতা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। অন্যদিকে, অনুমতি ছাড়া স্টল বসানো হয়ে থাকলে প্রশাসনের পদক্ষেপের যৌক্তিকতা নিয়ে পালটা বিতর্কও রয়েছে।

রবিবার সকাল থেকে যাদবপুর এলাকায় নতুন করে বড় ধরনের উত্তেজনার খবর না মিললেও পরিস্থিতির উপর নজর রাখছেন বাম নেতৃত্ব ও কর্মী-সমর্থকেরা।

বই কেনা ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বার্তা?

যাদবপুরের বুকস্টল-কাণ্ডে কুণাল ঘোষের উপস্থিতি নিছক বই কেনার ঘটনা, নাকি এর মধ্যে বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে—তা নিয়েই এখন আলোচনা। একদিকে, বুকস্টল সরাতে পুলিশের বুলডোজার অভিযানের অভিযোগ; অন্যদিকে, সেই স্টল থেকেই তৃণমূল বিধায়কের বই কেনা—দু’টি ঘটনাই রাজনৈতিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।

কুণাল ঘোষ নিজের বক্তব্যে স্পষ্ট করেছেন, বামেদের বই বিক্রির অধিকারকে তিনি সমর্থন করেন এবং বুলডোজার নিয়ে অভিযানের প্রতিবাদ জানাতেই যাদবপুরে এসে বই কিনেছেন। তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৃণমূল ও সিপিএমের রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনও বড় পরিবর্তন ঘটবে কি না, তার উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।

যাদবপুরের বুকস্টল আপাতত রক্ষা পেয়েছে বলে বাম শিবিরের দাবি। কিন্তু অনুমতি, প্রশাসনিক পদক্ষেপ, পুলিশের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক প্রকাশনার অধিকার নিয়ে বিতর্ক যে এখানেই থামছে না, তা রবিবার সকালের ঘটনাপ্রবাহ থেকেই স্পষ্ট।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment