পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় মুইজ্জুকে সতর্ক করল বিরোধীরা, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ

By Suman Debnath

October 28, 2026 8:20 PM

পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতায় মুইজ্জুকে সতর্ক করল বিরোধীরা, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ


পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মহম্মদ মুইজ্জুকে সতর্ক করল সে দেশের বিরোধী দল। তাদের আশঙ্কা, ইসলামাবাদের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা ভারতের সঙ্গে মালদ্বীপের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের অবনতি ঘটাতে পারে। তাতে দ্বীপরাষ্ট্রটির নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

মালদ্বীপের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট তথা বিরোধী দল মালদ্বীপিয়ান ডেমোক্রেটিক পার্টি বা এমডিপির চেয়ারম্যান মহম্মদ নাশিদ অভিযোগ করেছেন, যথাযথ বিবেচনা না করেই পাকিস্তান সফর করে মুইজ্জু দেশকে ভারত-পাকিস্তান বিরোধের মধ্যে টেনে এনেছেন। গত ২০-২২ অক্টোবর তিন দিনের সফরে পাকিস্তানে গিয়েছিলেন মুইজ্জু। গত ১১ বছরে মালদ্বীপের কোনও প্রেসিডেন্টের এটাই প্রথম পাকিস্তান সফর।

দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৬০ বছর পূর্তির সঙ্গে মিলে গিয়েছে এই সফর। সেখানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি, সেনাপ্রধান ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং উপপ্রধানমন্ত্রী ইশক দারের সঙ্গে বৈঠক করেন মুইজ্জু। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাণিজ্য, কৃষি, সাইবার নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে দুই দেশের মধ্যে ২০টি সমঝোতাপত্রও সই হয়েছে।

আগামী দু’বছরের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ ডলার থেকে বাড়িয়ে ২০ কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যও স্থির করেছে দুই দেশ। তবে এই সফরের পরেই মালদ্বীপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিতর্ক শুরু হয়েছে। ২৫ অক্টোবর আদ্দু সিটিতে এক সাংবাদিক সম্মেলনে নাশিদ বলেন, ছোট দেশগুলির, বিশেষত মালদ্বীপের সামনে যে ঝুঁকি রয়েছে, তা বিবেচনা না করেই পাকিস্তান সফর করেছেন মুইজ্জু।

আরও পড়ুন:  ফুসফুসে ক্যানসার পোপ চতুর্দশ লিওর, অস্ত্রোপচারে বাদ ডান ফুসফুসের নিম্নাংশ

তাঁর কথায়, ভারত যদি মনে করে যে তাদের নিরাপত্তার সঙ্গে আপস করা হচ্ছে, তাহলে মালদ্বীপকে তার ‘তিক্ত’ পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে। প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল্লাহ শহীদও অভিযোগ করেছেন, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে মুইজ্জু আবার ভারত-বিরোধী প্রচার শুরু করতে পারেন। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনও মুইজ্জুকে সম্মানসূচক ডক্টরেট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

মালদ্বীপের প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মারিয়া আহমেদ দিদি অবশ্য পাকিস্তানের সঙ্গে সব ধরনের সহযোগিতার বিরোধিতা করেননি। তাঁর মতে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাণিজ্য, কৃষি ও পর্যটনের মতো ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়লে মালদ্বীপের কূটনৈতিক অবস্থান, নিরাপত্তা সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক স্বার্থও চাপে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।

এই পরিস্থিতিতে মুইজ্জুর পাকিস্তান সফর নিয়ে ভারতের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত ২৪ অক্টোবর বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, দিল্লি দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া চুক্তিগুলির বিষয়ে অবগত এবং পরিস্থিতির উপর নজর রাখছে। প্রয়োজন হলে যথাযথ পদক্ষেপ করা হবে বলেও জানান তিনি।

পাকিস্তান সফরে গিয়ে মুইজ্জু দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বা সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। পরবর্তী শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের জন্য সদস্য দেশগুলির সঙ্গে কাজ করতে মালদ্বীপ প্রস্তুত বলেও জানান তিনি। ২০১৪ সালে কাঠমান্ডুতে সার্কের শেষ শীর্ষ সম্মেলন হয়েছিল। ২০১৬ সালে পাকিস্তানে পরবর্তী সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার জেরে তা বাতিল হয়ে যায়। ভারত বরাবরই বলে এসেছে, সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশ ছাড়া আঞ্চলিক সহযোগিতা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

আরও পড়ুন:  পাকিস্তানে ফের টার্গেট শুক্রবারের প্রার্থনা, কোহাটের মসজিদে আত্মঘাতী হামলায় নিহত অন্তত ১৬, আহত ৫০

ভারতের সঙ্গে মুইজ্জুর সম্পর্কের অতীতও এই বিতর্কের অন্যতম কারণ। ২০২৩ সালে মালদ্বীপে মোতায়েন ভারতীয় সেনাকর্মীদের প্রত্যাহারের দাবিতে ‘ইন্ডিয়া আউট’ প্রচার চালিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন তিনি। ২০২৪ সালের মে মাসে ভারতীয় সেনাকর্মীদের পরিবর্তে অসামরিক কারিগরি কর্মীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর থেকে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করার চেষ্টা করেছেন মুইজ্জু। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মালদ্বীপ সফরও সেই প্রক্রিয়ার অংশ ছিল।

আরও পড়ুন: দিল্লির এসসিও সম্মেলনে যোগ দিতে পাকিস্তানের মন্ত্রীকে আমন্ত্রণ ভারতের

তবে বিরোধীদের অভিযোগের অর্থ এই নয় যে, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করে ভারতকে চ্যালেঞ্জ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মুইজ্জু সরকার। সরকারের বক্তব্য, একাধিক দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখাই তাদের ‘মালদ্বীপ ফার্স্ট’ নীতির লক্ষ্য। কিন্তু ভারত মহাসাগরে মালদ্বীপের কৌশলগত অবস্থান এবং নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ভারতের গুরুত্বের কারণে পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কতটা বাড়ানো হবে তা নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment