কলকাতায় (Kolkata) অবৈধ নির্মাণ রুখতে আরও কঠোর অবস্থান নিল রাজ্য সরকার। এ বছরের ৩১ মার্চ ২০২৬-কে কাট-অফ তারিখ ধরে ওই সময়ের মধ্যে নির্মিত বাড়িগুলির বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানালেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Pal)। ছোটখাটো নির্মাণ ত্রুটিতে জরিমানা দিয়ে সমাধানের সুযোগ থাকলেও, বড় ধরনের নিয়মভঙ্গের ক্ষেত্রে ‘হিউজ পেনাল্টি’ বা বিপুল অঙ্কের জরিমানা ধার্য করা হবে বলে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন তিনি।
সোমবার নবান্নে (Nabanna) মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পুরমন্ত্রী জানান, অবৈধ নির্মাণের বিরুদ্ধে সরকার এবার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিতে চলেছে। বিশেষ করে যে সমস্ত বহুতল বা বাণিজ্যিক ভবনে অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত তলা, পেন্টহাউস বা অন্য কোনও কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কড়া আর্থিক শাস্তির পথে হাঁটবে প্রশাসন।
অগ্নিমিত্রা জানান, ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত তৈরি হওয়া বাড়ি নিয়ে যদি কলকাতা পুরসভা বা নগরোন্নয়ন দপ্তরে অভিযোগ জমা পড়ে, অথবা সরকারি তদন্তে কোনও অনিয়ম ধরা পড়ে, তাহলে তার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সামান্য বিচ্যুতি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ দেওয়া হতে পারে। তবে যেখানে অনুমোদন ছিল দু’তলা, অথচ নির্মাণ হয়েছে পাঁচতলা বা তারও বেশি, সেখানে আর কোনও ছাড় দেওয়া হবে না।
মন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এমন জরিমানা ধার্য করা হবে যাতে বেআইনি নির্মাণ করে পরে টাকা দিয়ে ‘রেগুলারাইজ়’ করার প্রবণতা বন্ধ হয়। তাঁর কথায়, জরিমানার পরিমাণ এমন হবে, যা ভবনের মালিক বা প্রোমোটারের উপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি করবে। বাণিজ্যিক ভবনের ক্ষেত্রে জরিমানার অঙ্ক আরও বেশি হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে তারাতলা (Taratala) গোডাউন ধসের ঘটনা। ওই দুর্ঘটনার পর রাজ্য সরকার নির্মাণে অনিয়ম খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছিল। সোমবার সেই কমিটির মেয়াদ আরও ১৫ দিন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে তদন্ত আরও বিস্তৃতভাবে চালানো যায়।
বৈঠকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে বাণিজ্যিক ভবনের পার্কিং ব্যবস্থা নিয়ে। সরকার জানিয়েছে, ভবনের আকার ও কর্মীর সংখ্যা অনুযায়ী পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকলে ভবিষ্যতে সেই প্রকল্পের নকশা অনুমোদন করা হবে না। অর্থাৎ, রাস্তার উপর নির্ভর করে পার্কিংয়ের সংস্কৃতিতে এবার লাগাম টানতে চাইছে প্রশাসন।
অগ্নিমিত্রা উদাহরণ দিয়ে বলেন, কোনও বাণিজ্যিক ভবনে যদি ২০০ জন কর্মী কাজ করেন, অথচ তাদের জন্য প্রয়োজনীয় পার্কিংয়ের ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে সেই ভবনের অনুমোদন মিলবে না। পার্কিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা ভবনের মধ্যেই রাখতে হবে—এটাই হবে নতুন নীতি।
এছাড়া বেআইনি পার্কিং নিয়েও মুখ্যমন্ত্রীকে বিস্তারিত জানানো হয়েছে বলে জানান পুরমন্ত্রী। সাধারণ মানুষের যাতায়াতে যাতে সমস্যা না হয়, সে জন্য আলাদা পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণা হল, ভবিষ্যতে নির্মীয়মাণ ভবনের কাজ পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব একটি স্বাধীন কেন্দ্রীয় সংস্থাকে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। ওই সংস্থার ছাড়পত্র না মিললে নির্মাণকাজ এগোবে না। প্রশাসনের দাবি, এতে নির্মাণের প্রতিটি ধাপে নজরদারি বাড়বে এবং অবৈধ নির্মাণের সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে।
রাজ্য সরকারের এই নতুন অবস্থান থেকে স্পষ্ট, শুধুমাত্র কলকাতা নয়, ভবিষ্যতে রাজ্যের অন্যান্য পুরসভাতেও একই ধরনের কঠোর নীতি কার্যকর হতে পারে। ফলে অবৈধ নির্মাণ ও নকশা-বহির্ভূত ভবনের বিরুদ্ধে প্রশাসনের অভিযান আগামী দিনে আরও জোরদার হওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
Leave a Comment