মাত্র ৩৯টি পদক—সংখ্যার নিরিখে এটি গত ২৪ বছরে কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের সবচেয়ে দুর্বল ফল। কিন্তু গ্লাসগো (Glasgow) কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬-কে শুধু পদকের সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। মাত্র ১০টি খেলাকে নিয়ে আয়োজিত এই আসরে শুটিং, কুস্তি, ব্যাডমিন্টন ও টেবল টেনিসের মতো ভারতের ঐতিহ্যবাহী পদকজয়ী ইভেন্ট বাদ পড়ার পরও ভারত ১৩টি সোনা, ১৭টি রুপো ও ৯টি ব্রোঞ্জ মিলিয়ে মোট ৩৯টি পদক জিতে চতুর্থ স্থানে শেষ করেছে। কঠিন পরিস্থিতিতেও এই সাফল্য ভারতীয় ক্রীড়ার নতুন দিশা দেখিয়েছে।
গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমস ছিল আগের আসরগুলির তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে আয়োজকরা প্রতিযোগিতার সূচি কমিয়ে মাত্র ১০টি খেলায় সীমাবদ্ধ রাখেন। ২০২২ সালের বার্মিংহ্যাম (Birmingham) গেমসে যেখানে ১৯টি খেলা ছিল, সেখানে এবার একাধিক জনপ্রিয় ইভেন্ট বাদ যায়।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ভারতের জন্য। কারণ শুটিং, কুস্তি, ব্যাডমিন্টন, টেবল টেনিস এবং হকি—এই পাঁচটি খেলাই ভারতের ঐতিহাসিক পদক ভাণ্ডারের অন্যতম প্রধান উৎস। শুধু বার্মিংহ্যাম গেমসেই এই পাঁচটি খেলা থেকে ভারত পেয়েছিল ৬১টির মধ্যে ৩০টি পদক এবং ১৩টি সোনা। ফলে শুরু থেকেই ভারতের সামনে ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে সেই ধাক্কাকে সুযোগে বদলে দেয় ভারতীয় দল। পদকজয়ের জন্য নতুন খেলাগুলির উপর জোর দিয়ে নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দেন ক্রীড়াবিদরা। শেষ পর্যন্ত পদক তালিকায় ভারত জায়গা করে নেয় চতুর্থ স্থানে, পিছনে ফেলে দেয় আয়োজক দেশ স্কটল্যান্ডকে (Scotland)। দুই দেশের মোট পদক সমান হলেও রুপোর সংখ্যায় এগিয়ে থাকায় ভারত চতুর্থ স্থান নিশ্চিত করে।
সবচেয়ে বড় অবদান এসেছে বক্সিং থেকে। ১৪ জনের ভারতীয় দল জিতে নেয় ১০টি পদক, যার মধ্যে ৭টি সোনা এবং ৩টি রুপো। মহিলাদের বিভাগে প্রীতি পাওয়ার (Preeti Pawar), জ্যাসমিন ল্যাম্বোরিয়া (Jaismine Lamboria), সাক্ষী চৌধুরী (Sakshi Chaudhary), প্রিয়া ঘাংঘাস (Priya Ghanghas) এবং অরুন্ধতী চৌধুরী (Arundhati Choudhary) সোনা জেতেন। পুরুষদের বিভাগে সোনা জেতেন সচিন সিওয়াচ (Sachin Siwach) এবং অঙ্কুশ পাংঘাল (Ankush Panghal)। কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাসে একক দেশের হিসেবে এটি বক্সিংয়ে ভারতের অন্যতম সেরা সাফল্য।
জুডোতেও তৈরি হয়েছে ইতিহাস। হর্ষ সিং (Harsh Singh) এবং অসমিতা দে (Asmita Dey) ভারতের হয়ে প্রথমবার কমনওয়েলথ গেমসে জুডোয় সোনা জিতে নতুন অধ্যায় লিখেছেন। পাশাপাশি যামিনী মৌর্য (Yamini Mourya) রুপো এবং উন্নতি শর্মা (Unnati Sharma) ব্রোঞ্জ জিতে ভারতের সেরা জুডো অভিযান সম্পূর্ণ করেন।
অ্যাথলেটিক্স এবং প্যারা-অ্যাথলেটিক্স মিলিয়ে ভারত জিতেছে ১৬টি পদক। অলিম্পিক সোনাজয়ী নীরজ চোপড়া (Neeraj Chopra) পুরুষদের জ্যাভলিনে রুপো জিতেছেন। গুলবীর সিং (Gulveer Singh) এক আসরে ১০,০০০ মিটার ও ৫,০০০ মিটারে দুটি পদক জিতে নজির গড়েছেন। তেজস্বিন শঙ্কর (Tejaswin Shankar) ডেকাথলনে ভারতের প্রথম কমনওয়েলথ পদক এনে দিয়েছেন।
প্যারা-স্পোর্টসেও এসেছে দারুণ সাফল্য। শর্মিলা ধনকর (Sharmila Dhankar), দিলীপ মহাদু গাভিত (Dilip Mahadu Gavit) এবং সোমন রানা (Soman Rana)-র সোনা মিলিয়ে ভারত এক আসরেই সাতটি পদক জিতে অতীতের সম্মিলিত সাফল্যের সমতা স্পর্শ করেছে।
ভারোত্তোলনেও ভারতের ভরসার নাম মীরাবাই চানু (Mirabai Chanu)। তিনি টানা তৃতীয়বার কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জিতে ইতিহাস গড়েছেন। তাঁর নেতৃত্বে ভারত ভারোত্তোলনে মোট ৮টি পদক জেতে, যার মধ্যে রয়েছে ১টি সোনা, ৬টি রুপো এবং ১টি ব্রোঞ্জ।
সংখ্যার বিচারে ৩৯টি পদক হয়তো গত ২৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। কিন্তু প্রেক্ষাপট বলছে, ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী খেলাগুলি না থাকলেও নতুন খেলায় নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার যে মানসিকতা এবং দক্ষতা ভারতীয় ক্রীড়াবিদরা দেখিয়েছেন, তা ভবিষ্যতের অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার জন্য বড় আশার বার্তা। গ্লাসগো ২০২৬ তাই শুধু পদকের হিসাব নয়, ভারতীয় ক্রীড়ার পরিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
Leave a Comment