সাড়ে চার বছর পেরিয়ে গিয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ (Russia-Ukraine War) থামার লক্ষণ নেই। অথচ শান্তির কথা চলছে জোরকদমে। দফায় দফায়। এর মধ্যেই ফের বোমা ফাটিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। তাঁর দাবি, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin) পারলে এখনই যুদ্ধ থামানোর জন্য শান্তিচুক্তি করতে চান। তাহলে আটকে কোথায়? ঠারেঠোরে ট্রাম্প বুঝিয়ে দিয়েছেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি (Volodymyr Zelenskyy) আসলে নাটের গুরু।
ট্রাম্প ঠিক কী বললেন
গট্রাম্প সাংবাদিকদের জানান, পুতিন চুক্তি করতে চান। জেলেনস্কিও যদি চান, তবে সেটা খুব ভালো হবে। সংঘাত থামছে না কেন, এই প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্পের ব্যাখ্যা, দুই নেতা একে অপরকে সহ্য করতে পারেন না। যদিও আগামীতে পুতিন ও জেলেনস্কিকে নিয়ে ত্রিপাক্ষিক বৈঠক (Trilateral Meeting) হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি তিনি।
এর আগের ঘটনাক্রম খানিকটা এরকম। ৫ সেপ্টেম্বর মস্কোয় পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ (Steve Witkoff) ও ট্রাম্পের জামাই জ্যারেড কুশনার (Jared Kushner)। পরে তাঁরা কিয়েভেও গিয়ে জেলেনস্কির সঙ্গে কথা বলেন। তার পরেই ট্রাম্প ও পুতিনের মধ্যে প্রায় এক ঘণ্টার ফোনালাপ হয়। ক্রেমলিনের (Kremlin) দাবি, সেই আলাপ ছিল যথেষ্ট গঠনমূলক ও খোলামেলা।
পুতিন কি সত্যিই শান্তি চান
এখানেই প্রশ্নটা জোরালো। ওয়াশিংটনের থিংক ট্যাংক অ্যাটলান্টিক কাউন্সিলের (Atlantic Council) বিশ্লেষণ বলছে, ট্রাম্পের দূতেরা যখন দুই পক্ষেরই জেতার রাস্তা খুঁজছেন, পুতিন তখন খেলছেন এক পক্ষের জেতার খেলা।
রাশিয়া-ইউক্রেন মূল সংঘাত এখন দনবাসকে (Donbas) ঘিরে। পুতিন গোটা দনবাসের নিয়ন্ত্রণ চান। জেলেনস্কি ভূখণ্ড ছাড়ার প্রশ্নে লক্ষ্মণরেখা টেনে রেখেছেন। বর্তমান সীমান্তরেখায় লড়াই থামাতে তিনি অনেকটাই রাজি।
আলোচনার টেবিলে যখন পুতিন হাসিমুখে, তখনই রণাঙ্গনে আগুন বর্ষাচ্ছেন। মার্কিন প্রতিনিধিদের সফরের আগে কিয়েভ ও বরিসপিল (Boryspil) বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে রাশিয়া, দাবি জেলেনস্কির। ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষায় ঘাটতির সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন শহরে বোমাবর্ষণও বেড়েছে বলে খবর।
উল্টো অভিযোগ পুতিনেরও আছে। জুলাইয়ের এক ফোনালাপে তিনি ট্রাম্পকে বলেছিলেন, কিয়েভ ও ইউরোপীয় মিত্ররাই যুদ্ধ টেনে লম্বা করতে চাইছে। একই ফোনালাপে তিনি কস্তিয়ান্তিনিভকা (Kostyantynivka) দখলের দাবিও করেন। যদিও কিয়েভ সেই দাবি মানেনি।
জেলেনস্কি কোথায় আটকে
জেলেনস্কি আলোচনার দরজা বন্ধ করেননি। মার্কিন দূতদের সফরের পর তিনি বলেছিলেন, আলোচনার কোনও নির্দিষ্ট কাঠামো না থাকার চেয়ে কোনও একটা কাঠামো থাকা ভালো। অর্থাৎ, তিনি চাইছেন ইস্যুভিত্তিক আলোচনা। তবে সময়টা তাঁর কাছে কঠিন। কারণ, দূতদের সঙ্গে কথা বলে তিনি নিজেই মেনে নিয়েছেন, যুদ্ধ ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়াতে পারে। জানুয়ারিতে তিনি বলেছিলেন, ইউক্রেন শান্তির পথে বাধা নয়। চাপ দিতে হবে রাশিয়াকেই। কিন্তু এখন যুদ্ধ থামার কোনও সম্ভাবনা তিনি নিজেই দেখতে পাচ্ছেন না।
ট্রাম্পের কথার আড়ালে কোন কৌশল
ট্রাম্পের এই কথা, যা নিয়ে এত হইচই, তা কিন্তু নতুন নয়। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ক্রিমিয়া ছাড়তে জেলেনস্কি রাজি না হওয়ার পর ট্রাম্প তাঁকে সরাসরি যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার দায়ে অভিযুক্ত করেছিলেন। ডিসেম্বরে বলেছিলেন, জেলেনস্কি মার্কিন প্রস্তাব পড়েই দেখেননি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে রয়টার্সকে ট্রাম্প জানান, পুতিন চুক্তির জন্য তৈরি, ইউক্রেন এখনও রাজি নয়।
তবে তফাত একটা আছে। আগে ছিল সরাসরি অভিযোগ। এখন আছে নরম বাক্যের মোড়কে একটা সন্দেহ উস্কে দেওয়া। জেলেনস্কি চাইলে ভালো হয়, এমন কথায় দোষ সরাসরি দেওয়া হয় না। অথচ প্রশ্নটা ঝুলিয়ে রাখা হয় যে, আসলে ইউক্রেনই যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এই কৌশলে ওয়াশিংটন নিজেকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে দেখাতে পারে। চাপে রাখতে পারে কিয়েভেকে। ক্রেমলিনের বিবরণ অনুযায়ী, ট্রাম্প ফোনে জানিয়েছেন তিনি রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক করতে চান। যদিও হোয়াইট হাউস এ নিয়ে আলাদা করে কিছু বলেনি। ফলে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক মেরামত করতে ট্রাম্প যে ইউক্রেনকে কোণঠাসা করবেন, সেটা বাস্তবসম্মত। দাবি কূটনীতিকদের।
বৈঠকের আগে যা জরুরি
ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের প্রশ্নে পুতিনের অবস্থান কী, সেটা জানাও জরুরি। মে মাসে তিনি বলেছিলেন, তৃতীয় কোনও দেশে জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠক সম্ভব। তবে শান্তিচুক্তি চূড়ান্ত হওয়ার পরেই এমন বৈঠকে তিনি বসবেন। অর্থাৎ চুক্তি না হলে বৈঠক নেই। আবার বৈঠক ছাড়া চুক্তিই বা হবে কীভাবে। এই ধাঁধার উত্তর না মিললে ট্রাম্পের যুদ্ধ থামার আশা কাগজেই থেকে যাবে। বাস্তবায়িত হবে না।
বাংলাও জড়িয়ে
দূরের যুদ্ধ মনে হলেও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ছাপ পড়ে বাংলাতেও। রাশিয়া ও ইউক্রেন দুই দেশই গম ও সূর্যমুখী তেলের বড় জোগানদার। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, অশোধিত তেল (Crude Oil), সার ও ভোজ্য তেলের দামে অনিশ্চয়তা তত বাড়বে। তার প্রভাব পড়বে জ্বালানির দামে, হেঁশেলে এবং আপনার মাসিক বাজেটে।
এরপর কী
শান্তি চাওয়া আর শান্তির শর্ত মেনে নেওয়া এক জিনিস নয়। দনবাসের প্রশ্নে দুই পক্ষ যতদিন অনড়, যুদ্ধবিরতি (Ceasefire) ততদিন দূরের স্বপ্ন। নজর এখন একটাই। ট্রাম্প সত্যিই তিন নেতাকে এক টেবিলে বসাতে পারেন কি না।
Leave a Comment