পাঁচ বছরে দেশে প্রায় ৩,৪০০ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা: লোকসভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের উদ্বেগজনক তথ্য, অথচ গণপিটুনির আলাদা হিসাবই নেই কেন্দ্রের হাতে

By Suman Debnath

October 20, 2026 7:45 PM

পাঁচ বছরে দেশে প্রায় ৩,৪০০ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা: লোকসভায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের উদ্বেগজনক তথ্য, অথচ গণপিটুনির আলাদা হিসাবই নেই কেন্দ্রের হাতে


গত পাঁচ বছরে দেশজুড়ে প্রায় ৩,৪০০টি সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় দাঙ্গার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। লোকসভায় লিখিত প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দেওয়া পরিসংখ্যানেই দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা ও সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির এই উদ্বেগজনক ছবি সামনে এসেছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই সংসদকে জানিয়েছেন, ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দেশে মোট ৩,৩৯৯টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মামলা রুজু হয়েছে। তবে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের বিস্তারিত হিসাব দিলেও দেশজুড়ে ঘটে চলা গণপিটুনি বা মব লিঞ্চিংয়ের কোনও পৃথক তথ্য ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (NCRB) কাছে নেই বলেই জানিয়ে দিয়েছে কেন্দ্র।

কোন বছরে কত সংঘর্ষ

 কংগ্রেস সাংসদ শশী থারুর এবং বিজেপি সাংসদ চন্দ্রপ্রকাশ যোশীর করা এক যৌথ প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই পাঁচ বছরের ধারাবাহিক পরিসংখ্যান পেশ করেন। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর সেই তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশে ৮৬৯টি এবং ২০১৭ সালে ৭২৩টি সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছিল। পরবর্তী দুই বছরে সেই সংখ্যা কিছুটা কমে ২০১৮ সালে ৫১২ এবং ২০১৯ সালে ৪৩৮-এ নেমে আসে।

আরও পড়ুন:  ‘চলো সংসদ’ মিছিলে উত্তেজনা দিল্লিতে, পুলিশের লাঠিচার্জের অভিযোগ, মধ্য দিল্লির একাধিক এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ

কিন্তু ২০২০ সালে অতিমারি এবং দেশজোড়া লকডাউনের আবহেও সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা এক ধাক্কায় প্রায় ৯৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৮৫৭টিতে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে উত্তর-পূর্ব দিল্লির রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা এবং সিএএ-বিরোধী আন্দোলনের সময় তৈরি হওয়া মেরুকরণের জেরেই ওই বছর সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের গ্রাফ আচমকা দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল।

আড়াই লক্ষের বেশি মামলা

 শুধুমাত্র ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষই নয়, কেন্দ্রের পেশ করা তথ্যে দেখা যাচ্ছে ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দেশজুড়ে সব ধরনের দাঙ্গা ও গোষ্ঠীসংঘর্ষ মিলিয়ে মোট ২ লক্ষ ৭৬ হাজার ২৪৬টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৬ সালে সর্বাধিক ৬১,৯৪৭টি, ২০১৭ সালে ৫৮,৮৮০টি, ২০১৮ সালে ৫৭,৮২৮টি, ২০১৯ সালে ৪৫,৯৮৫টি এবং ২০২০ সালে ৫১,৬০৬টি দাঙ্গার ঘটনা নথিভুক্ত হয়। অর্থাৎ ২০২০ সালে দেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৪১টি করে অশান্তি বা দাঙ্গার মামলা রুজু হয়েছে।

এই একই সময়কালে জাতপাতভিত্তিক সংঘর্ষ ৫০ শতাংশ এবং কৃষিকেন্দ্রিক অশান্তি ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, জাতীয় স্তরে যখন সাম্প্রদায়িক ও গোষ্ঠীগত হিংসার এই চড়া প্রবণতা বজায় থেকেছে, তখন এনসিআরবি-র পরিসংখ্যানেই দেখা গিয়েছে যে পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের দাঙ্গার ঘটনা সাত বছরের ব্যবধানে প্রায় ছয় গুণ হ্রাস পেয়েছে। বিহার, মহারাষ্ট্র এবং হরিয়ানার মতো রাজ্যগুলিতেই এই ধরনের মামলার সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি।

আরও পড়ুন:  ব্রিকস থেকে ভারত কী পেল? দিল্লির কূটনীতির আসল সাফল্য কোথায়

গণপিটুনি নিয়ে নীরবতা

লোকসভায় সাংসদরা জানতে চেয়েছিলেন, দেশে ক্রমবর্ধমান গণপিটুনি ও সাম্প্রদায়িক হিংসা রুখতে সরকার নতুন কোনও কড়া আইন আনার কথা ভাবছে কি না। জবাবে নিত্যানন্দ রাই জানান, এনসিআরবি-র পক্ষ থেকে গণপিটুনির ঘটনার কোনও আলাদা তালিকা বা ডেটাবেস তৈরি করা হয় না।

 তবে সমসাময়িক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে এবং সমাজের দুর্বল ও প্রান্তিক মানুষের কাছে দ্রুত ন্যায়বিচার পৌঁছে দিতে ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার আমূল সংস্কারের প্রক্রিয়া শুরু করেছে কেন্দ্র। ২০১০ সালের জুন মাসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সুপারিশ মেনে সব রাজ্য সরকার, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি, সাংসদ এবং আইন বিশ্ববিদ্যালয়গুলির সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে ফৌজদারি আইনে সার্বিক সংশোধনের পথে হাঁটা হচ্ছে বলে লোকসভায় জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment