বাংলাদেশের ভ্যাট ব্যবস্থাকে আধুনিক, স্বচ্ছ এবং কাগজবিহীন করার লক্ষ্য নিয়ে গত দেড় দশকে বড় পরিসরে ডিজিটাল উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এই উদ্যোগের অন্যতম অংশ ছিল ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস (ইএফডি) ও সেলস ডাটা কন্ট্রোলার (এসডিসি) চালু করা। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ৩৪৭ কোটি টাকা ব্যয় হলেও বাস্তব চিত্র আশানুরূপ নয়।
প্রথম ধাপে বিদেশ থেকে প্রায় ১০ হাজার ইএফডি ও এসডিসি ডিভাইস সংগ্রহে ব্যয় করা হয় প্রায় ৩১৭ কোটি টাকা। তবে বিভিন্ন কারিগরি সীমাবদ্ধতা, নিম্নমানের যন্ত্র, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর বাস্তবায়নের ঘাটতির কারণে এসব ডিভাইসের বড় অংশই কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।
সম্ভাবনার তুলনায় রাজস্ব আদায় অনেক কম
বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৭৫ লাখ খুচরা ও পাইকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার ভ্যাট আদায় সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে আদায় হচ্ছে মাত্র প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ ভ্যাট আদায়ের সম্ভাবনার প্রায় ৯৭ শতাংশই সরকারি কোষাগারে পৌঁছাচ্ছে না। ভোক্তারা নিয়মিত ভ্যাট পরিশোধ করলেও নকল চালান, প্যারালাল বিলিং এবং ইএফডি ব্যবহার না করার কারণে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার।
চুক্তির লক্ষ্য পূরণ হয়নি
ইএফডি প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পাওয়া বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জেনেক্স ইনফোসিসের সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী, পাঁচ বছরের মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রামে তিন লাখ ডিভাইস স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল।
এ লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব অর্থায়নে যন্ত্র সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নেয় এবং সংগৃহীত ভ্যাটের ওপর নির্ধারিত কমিশন পাওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু নির্ধারিত সময়ের দুই বছর অতিক্রম করলেও স্থাপন করা হয়েছে মাত্র ১১ হাজার থেকে ১৬ হাজারের মতো ডিভাইস। ফলে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে।
হাজারো ডিভাইস অকার্যকর
২০২০ সালে ইএফডি কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ২৫ হাজারের বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইএফডি ও এসডিসি ডিভাইস স্থাপন করা হয়।
কিন্তু ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহ, যন্ত্রের ত্রুটি, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং দুর্বল তদারকির কারণে এসব ডিভাইসের উল্লেখযোগ্য অংশ বর্তমানে অচল অথবা ব্যবহারবিহীন অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
ইএফডি লটারি জনপ্রিয় হয়নি
ভ্যাট চালান গ্রহণে জনগণকে উৎসাহিত করতে ২০২১ সালে ইএফডি লটারির ব্যবস্থা চালু করে এনবিআর।
মাসভিত্তিক ড্রয়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হলেও এই উদ্যোগ প্রত্যাশিত সাড়া পায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ভ্যাট চালানে সঠিক তথ্য না থাকা, পুরস্কার সংগ্রহের জটিলতা, ক্রেতাদের অনাগ্রহ এবং সচেতনতার অভাবের কারণে লটারি কার্যক্রম কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
প্যারালাল বিলিংয়ে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার
মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইএফডি মেশিন স্থাপন করা থাকলেও তা নিয়মিত ব্যবহার করা হয় না।
অনেক প্রতিষ্ঠান “সার্ভার সমস্যা”, “ইন্টারনেট নেই”, “বিদ্যুৎ বিভ্রাট” কিংবা “মেশিন নষ্ট”—এ ধরনের অজুহাতে ইএফডি বন্ধ রেখে আলাদা সফটওয়্যার বা হাতে লেখা রসিদ ব্যবহার করছে।
ফলে ক্রেতার কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করা হলেও সেই তথ্য এনবিআরের সার্ভারে পৌঁছায় না এবং রাজস্ব সরকারি কোষাগারে জমা না হয়ে অন্যত্র চলে যায়।
বিদেশে সফল, বাংলাদেশে ব্যর্থ কেন?
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একই ধরনের ডিজিটাল ভ্যাট ব্যবস্থা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে।
রুয়ান্ডা, পর্তুগাল, উগান্ডা, কেনিয়া ও তানজানিয়ার মতো দেশগুলো শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করেনি; বরং রিয়েল-টাইম ডেটা, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, ই-ইনভয়েসিং, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং ক্রেতাদের আর্থিক প্রণোদনা একসঙ্গে চালু করেছে।
ফলে এসব দেশে ভ্যাট আদায়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি এসেছে এবং কর ফাঁকি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
অর্থনীতি ও কর বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে ইএফডি প্রকল্পের প্রধান দুর্বলতা হলো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের সমন্বয়হীনতা।
তাদের মতে—
• কেবল প্রযুক্তি স্থাপন করলেই কর ফাঁকি কমে না।
• এআইভিত্তিক নজরদারি ও রিয়েল-টাইম মনিটরিং প্রয়োজন।
• করদাতার সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজ গড়ে তুলতে হবে।
• ই-ইনভয়েসিং বাধ্যতামূলক করতে হবে।
• দুর্নীতি ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে অটোমেশন কার্যকর হবে না।
ভ্যাট দিচ্ছেন ক্রেতা, কিন্তু অর্থ যাচ্ছে কোথায়?
দেশের খুচরা বাজারে ভ্যাট ফাঁকির নতুন কৌশল হিসেবে আলোচনায় এসেছে ‘প্যারালাল বিলিং’। এই পদ্ধতিতে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিজেদের সফটওয়্যার ব্যবহার করে এনবিআরের ইএফডি রসিদের মতো দেখতে ভুয়া বিল তৈরি করছে। বিলে ভ্যাটের হার, পণ্যের বিবরণ ও করের অঙ্ক উল্লেখ থাকলেও এতে থাকে না এনবিআরের ইউনিক শনাক্তকরণ নম্বর বা কিউআর কোড। ফলে ক্রেতা ভ্যাট দিলেও সেই অর্থ সরকারি হিসাবে জমা পড়ে না।
তদন্তে মিলেছে বড় অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকির তথ্য
ভ্যাট নিরীক্ষা, গোয়েন্দা ও তদন্ত কর্মকর্তাদের বিভিন্ন অভিযানে একাধিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের ভ্যাট ফাঁকির প্রমাণ মিলেছে। গত পাঁচ বছরে ১২৬টি প্রতিষ্ঠানের হিসাবপত্র যাচাই করে প্রায় ১ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকার ভ্যাট গোপনের তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসিআর থেকে ইএফডি পর্যন্ত বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও দুর্বল পরিকল্পনা, অদক্ষ বাস্তবায়ন এবং জবাবদিহিতার অভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।
বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও রাজস্ব আদায় অত্যন্ত কম
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির তথ্য অনুযায়ী দেশে প্রায় ৭৫ লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ খাত থেকে বছরে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা ভ্যাট আদায়ের সম্ভাবনা থাকলেও বর্তমানে সরকারের আয় মাত্র প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ সম্ভাব্য ভ্যাটের বিশাল অংশই রাজস্ব খাতে জমা হচ্ছে না। অথচ ভোক্তারা পণ্য ও সেবা কেনার সময় নিয়মিত ভ্যাট পরিশোধ করছেন।
দুর্বল নজরদারি ও সামান্য জরিমানায় বাড়ছে অনিয়ম
ভ্যাট আইন অনুযায়ী কর ফাঁকির জন্য কঠোর শাস্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা কার্যকর হয় না। বর্তমানে ইএফডি ব্যবহার না করা বা বৈধ রসিদ না দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিদিন বিপুল অঙ্কের লেনদেন করা বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এই জরিমানা কার্যত কোনো বাধা তৈরি করতে পারছে না। ফলে আইন ভঙ্গের প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে।
ব্যবসায়ীদের মতামত
বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, ভ্যাট অটোমেশন প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হলেও প্রত্যাশিত ফল আসেনি। তাদের মতে, প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের প্রশিক্ষণ, বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত গ্রহণ করা জরুরি ছিল।
প্রযুক্তি থাকলেও ব্যবহারে অনীহা
কর বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী এখনও নগদ লেনদেনকে বেশি নিরাপদ মনে করেন। ফলে ইএফডি ব্যবহারের পরিবর্তে কাগজের বিল বা অনানুষ্ঠানিক রসিদ দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
এছাড়া আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় সব বিক্রয় তথ্য যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত বিক্রয়ের একটি অংশ ইএফডিতে নিবন্ধিত হলেও বাকি অংশ সিস্টেমের বাইরে থেকে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন
অর্থনীতিবিদ ও কর বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি স্থাপন করাই চূড়ান্ত সমাধান নয়। কার্যকর তদারকি, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, ঝুঁকিভিত্তিক অডিট এবং এআইভিত্তিক মনিটরিং একসঙ্গে চালু না হলে ডিজিটাল ভ্যাট ব্যবস্থা কখনোই কাঙ্ক্ষিত সফলতা অর্জন করবে না।
তাদের মতে, ভ্যাট আদায়ে আন্তর্জাতিকভাবে সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সমন্বিত ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—উভয় পক্ষের সচেতনতা বাড়ানো এবং আইন বাস্তবায়নে কঠোরতা নিশ্চিত করাই হতে পারে রাজস্ব ফাঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
আমার বাঙলা/ জামান
Leave a Comment