মেলাঘর, ৯ জুন: “জলের অপর নাম জীবন”— এই প্রবাদবাক্যই যেন আজ প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে দক্ষিণ তইবান্দাল এলাকায়। স্থানীয় একটি ইনোভেটিভ জল পরিশোধন কেন্দ্রের বেহাল অবস্থা এবং জলাধারে শ্যাওলার স্তর জমে থাকার অভিযোগে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে এলাকাবাসীর মধ্যে। তাঁদের আশঙ্কা, এই জল পান করে যে কোনো সময় স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন হাজার হাজার মানুষ।
দক্ষিণ তইবান্দালে অবস্থিত এই জল পরিশোধন কেন্দ্রটি একসময় এলাকার মানুষের কাছে নিরাপদ পানীয় জলের অন্যতম ভরসা ছিল। তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের আমলে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী Manik Sarkar-এর হাত ধরে কেন্দ্রটির উদ্বোধন হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে কেন্দ্রটির অবস্থা দেখে সেই উন্নয়নের চিত্র যেন অতীতের স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জল পরিশোধন কেন্দ্রের বিভিন্ন অংশে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব স্পষ্ট। কোথাও জলাধারের উপর শ্যাওলা জমে রয়েছে, কোথাও আবার খোলা আকাশের নিচে জল সংরক্ষণ করা হচ্ছে। ফলে পরিশোধিত জলের গুণমান নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। এলাকাবাসীর মতে, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং পর্যবেক্ষণের অভাবের কারণে পরিস্থিতি দিন দিন আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।
জানা গেছে, এই জল পরিশোধন কেন্দ্রের মূল জল সরবরাহ আসে চণ্ডীর বান হ্রদ থেকে। সম্প্রতি ওই জলাশয়ের জলে শ্যাওলা জমে থাকার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ফলে উৎসস্থলের জলের মান নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার প্রভাব পরিশোধন কেন্দ্রের জল সরবরাহ ব্যবস্থার উপরও পড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় দূষিত জলই অনেক ক্ষেত্রে মানুষের ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে।
এলাকার বাসিন্দারা আরও জানান, জল পরিশোধন কেন্দ্রটির চারপাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই। কেন্দ্রটির সীমানা ঘিরে কোনো শক্তিশালী বাউন্ডারি না থাকায় যে কেউ সহজেই প্রবেশ করতে পারে। এতে শুধু নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিই নয়, জল দূষণের আশঙ্কাও বেড়ে যাচ্ছে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে তার দায়ভার কে নেবে— সেই প্রশ্নও তুলছেন স্থানীয় মানুষ।
অনেকেই আক্ষেপ করে বলেন, সরকারি জলের উপর আস্থা হারিয়ে তারা এখন বাজার থেকে বোতলজাত জল কিনে পান করতে বাধ্য হচ্ছেন। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এটি বাড়তি আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়ালেও নিরাপত্তার স্বার্থে অন্য কোনো বিকল্প নেই বলেই দাবি তাঁদের।
এদিকে, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার বিভিন্ন সময়ে জল জীবন মিশন প্রকল্পের মাধ্যমে নিরাপদ পানীয় জল সরবরাহের কথা তুলে ধরেছে। কোটি কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবিও করা হয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ তইবান্দালের এই চিত্র সেই দাবির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ মানুষ।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, এলাকার জনপ্রতিনিধিদেরও বিষয়টি নিয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেওয়া উচিত। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে সমস্যার কথা জানানো হলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। ফলে জনস্বাস্থ্য ও নিরাপদ পানীয় জলের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে।
বর্তমানে দক্ষিণ তইবান্দাল ও সংলগ্ন এলাকার বহু মানুষ এই জল পরিশোধন কেন্দ্রের উপর নির্ভরশীল। তাই দ্রুত রক্ষণাবেক্ষণ, জলাধার পরিষ্কার, নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণ এবং জলের গুণগত মান পরীক্ষার দাবি তুলেছেন এলাকাবাসী।
এখন দেখার বিষয়, এই সমস্যা প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং প্রশাসন কতটা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। মানুষের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও উদ্বেগের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে জল পরিশোধন কেন্দ্রটির সংস্কার ও আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হবে কি না, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ নিরাপদ পানীয় জল কোনো বিলাসিতা নয়, এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
Leave a Comment