ইরানের পরমাণু ও তেলের ঘাঁটিতে ‘মাদার অফ অল বম্বস’ ফেলবে আমেরিকা, নির্বাচনের মুখে ট্রাম্পের নতুন রণকৌশল

By Suman Debnath

October 15, 2026 7:10 PM

ইরানের পরমাণু ও তেলের ঘাঁটিতে ‘মাদার অফ অল বম্বস’ ফেলবে আমেরিকা, নির্বাচনের মুখে ট্রাম্পের নতুন রণকৌশল


টানা ছ’মাসের বেশি সময় ধরে লাগাতার বোমা বর্ষণ করেও তেহরানকে বাগে আনা যায়নি। উল্টে আমেরিকায় মধ্যবর্তী নির্বাচনের মুখে যুদ্ধবিরোধী ক্ষোভের জেরে রীতিমতো কোণঠাসা রিপাবলিকান শিবির। এই জোড়া রাজনৈতিক ও সামরিক চাপের মুখে এবার সম্পূর্ণ নতুন এবং আগ্রাসী এক যুদ্ধপরিকল্পনা সাজাল পেন্টাগন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর তৈরি এই নতুন রূপরেখায় উঠে এসেছে তাদের অস্ত্রাগারের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রথাগত অ-পারমাণবিক বোমা ‘মোয়াব’ (MOAB-Massive Ordnance Air Blast)। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চূড়ান্ত সবুজ সংকেত দিলেই মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বা পরে যে কোনও মুহূর্তে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিকাঠামো এবং পরমাণু কেন্দ্রগুলিকে লক্ষ্য করে আছড়ে পড়তে পারে এই দানবীয় অস্ত্র। যা ‘মাদার অফ অল বম্বস’ বলেই সামরিক জগতে পরিচিত।

 মার্কিন সংবাদ মাধ্যম সিএনএন এই মারাত্মক খবরটি প্রকাশ্যে এনেছে। খবর, মার্কিন প্রশাসনের একটি বড় অংশ ঘরোয়া রাজনীতিতে যুদ্ধের ইতি টানার একটি সম্মানজনক পথ বা ‘অফ-র‍্যাম্প’ (off-ramp) খুঁজছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে লড়াই থামানোর বার্তা না দিয়ে বার বার দাবি করছেন যে, ইরানে আমেরিকার অসমাপ্ত কাজ এখনও বাকি রয়েছে। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) খুলে দেওয়ার মতো সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক সাফল্য ছাড়া স্রেফ সেনা প্রত্যাহার করে নিলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তা মার্কিন পরাজয় হিসেবে ধরা হবে। সেই প্রেক্ষাপটেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে সেনা ফিরিয়ে আনার ঠিক আগে এক বিধ্বংসী ‘প্রতীকী জয়’ প্রদর্শনের ছক কষছে ওয়াশিংটন।

২১ হাজার পাউন্ডের বিস্ফোরণ

আরও পড়ুন:  পাকিস্তানে বড় সামরিক রদবদল! পরমাণু বোমার নিয়ন্ত্রণও এবার হাতে নিলেন মুনির, চিন্তা বাড়ছে ভারতের

 মার্কিন সামরিক নথিতে ‘মাদার অফ অল বম্বস’ (Mother of All Bombs) নামে পরিচিত ২১,৬০০ পাউন্ড ওজনের এই জিপিএস-নিয়ন্ত্রিত দানবাকৃতি বোমাটি মাটি ছোঁয়ার আগেই মাঝ-আকাশে বিস্ফোরিত হয়। একসঙ্গে প্রায় ন’টি শহরের সমতুল্য এলাকা নিমেষে ধ্বংস করে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে এর। পেন্টাগনের এই নতুন নিশানায় রয়েছে ইরানের তেলের খনি, পরিশোধনাগার ইত্যাদি ছাড়াও অত্যন্ত সংবেদনশীল পরমাণু ঘাঁটি ‘পিকঅ্যাক্স পর্বত’ (Pickaxe Mountain)।

 ওয়াশিংটন এবং তেল আভিভের দৃঢ় বিশ্বাস, দুর্গম এই পার্বত্য অঞ্চলের গভীরে ইরান তাদের পরমাণু অস্ত্র তৈরির মূল প্রযুক্তি ও উপাদান লুকিয়ে রেখেছে। দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাম্প এই ঘাঁটিতে সরাসরি হামলার হুমকি দিয়ে আসছেন এবং তাঁর স্পষ্ট লক্ষ্য, তেহরান যাতে কোনও অবস্থাতেই পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হয়ে উঠতে না পারে। সেন্ট্রাল কমান্ডের (CENTCOM) আওতাধীন অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের আগে এই পর্বত ও সংলগ্ন জ্বালানি পরিকাঠামোকে ধূলিসাৎ করে দেওয়ার জন্যেই মোয়াবের মতো অস্ত্রকে বিকল্প তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে।

মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ

 দানবীয় এই অস্ত্র ব্যবহারে সামরিক সাফল্য কতটা নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে মার্কিন সামরিক বিশেষজ্ঞদের অন্দরেই প্রবল সংশয় দেখা দিয়েছে। সমর বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ, মোয়াব মূলত ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ বা বাঙ্কার ধ্বংস করার উপযোগী পেনিট্রেটিং অস্ত্র (deep penetration warhead) নয়। পিকঅ্যাক্স পর্বতের পরমাণু ঘাঁটিটি মাটির অনেক গভীরে গ্রানাইট পাথরের পুরু প্রাকৃতিক স্তরে সুরক্ষিত। ফলে আকাশে সুবিশাল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ভূপৃষ্ঠের ব্যাপক ক্ষতি করা সম্ভব হলেও পাথরের বহু গভীরে থাকা পরমাণু কেন্দ্র এতে সম্পূর্ণ ধ্বংস হবে কি না, তা নিয়ে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।

আরও পড়ুন:  লিন্ডসে গ্রাহামের মৃত্যু ঘিরে জল্পনা, ষড়যন্ত্রের দাবি নিয়ে বিতর্ক

একই সঙ্গে তেল শোধনাগার বা লোকালয়ের কাছাকাছি এই বোমা ফেলা হলে বিপুল সাধারণ নাগরিকের প্রাণহানির (civilian casualties) আশঙ্কা রয়েছে। ফলে যুদ্ধজয়ের চেয়েও এটি প্রতিপক্ষকে ভয় পাইয়ে দেওয়ার একটি ‘মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র’ (psychological weapon) হিসেবেই বেশি কার্যকর বলে মনে করা হচ্ছে। সামরিক আধিকারিকদের একাংশ এই পরিকল্পনাকে নিছক চোখধাঁধানো ‘আতশবাজির প্রদর্শনী’ হিসেবে বর্ণনা করছেন, যার মাধ্যমে সামরিক লক্ষ্য হাসিল না হলেও রাজনৈতিক ভাবে ট্রাম্পকে একটি বড়সড় জয়ের আবহ তৈরি করে দেওয়া যাবে।

হোয়াইট হাউসের রণকৌশল

 এর আগে ২০১৭ সালে নিজের প্রথম মেয়াদে আফগানিস্তানের নানগারহারে আইএসআইএস (ISIS) জঙ্গিদের সুড়ঙ্গজাল ধ্বংস করতে এই মোয়াব ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ইতিহাসে প্রথম বার মার্কিন সামরিক বাহিনী সেই বিধ্বংসী অস্ত্রের প্রয়োগ করেছিল। তবে ইরানের মতো সুসংগঠিত সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে এমন অস্ত্রের ব্যবহার পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঠেলে দিতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।

 হোয়াইট হাউস অবশ্য সরাসরি এমন কোনও পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করতে নারাজ। তাদের সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া, ইরানকে পরমাণু অস্ত্র অর্জন থেকে আটকাতে প্রেসিডেন্টের টেবিলে সমস্ত বিকল্পই উন্মুক্ত রয়েছে। পেন্টাগনও জানিয়েছে, সামরিক বাহিনী প্রেসিডেন্টের যে কোনও নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য সব ধরনের পরিস্থিতির প্রস্তুতি সেরে রাখছে।

অতএব, সামগ্রিকতার নিরিখে বলাই যায়, ভয়ঙ্কর কিছু অপেক্ষায়।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment