ও একটা দৈত্য, ওকে কেউ চেনেও না: হোয়াইট হাউসে দাঁড়িয়েই গুগলের সুন্দর পিচাইকে যা তা বললেন ট্রাম্প, হইচই

By Suman Debnath

September 30, 2026 7:15 PM

ও একটা দৈত্য, ওকে কেউ চেনেও না: হোয়াইট হাউসে দাঁড়িয়েই গুগলের সুন্দর পিচাইকে যা তা বললেন ট্রাম্প, হইচই


হোয়াইট হাউসের রোদে ঝলমলে লনে তখন ভিড় জমিয়েছেন বিশ্বের তাবড় তথ্যপ্রযুক্তি কর্তারা। সাংবাদিকদের ক্যামেরার সামনে মেজাজে দাঁড়িয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাশে দাঁড়িয়ে গুগলের (Google) মূল সংস্থা অ্যালফাবেটের (Alphabet) সিইও সুন্দর পিচাই। হঠাৎই ঘাড় ঘুরিয়ে পিচাইয়ের উদ্দেশে ট্রাম্প বললেন, সুন্দর, তুমি কিছু বলতে চাও? পিচাই স্বভাবসিদ্ধ বিনম্রতায় মাইক্রোফোনের দিকে এগিয়ে কেবল শুরু করেছিলেন, প্রথমেই অসংখ্য ধন্যবাদ…। কিন্তু বাক্যটি শেষ করার সুযোগ পেলেন না। মাঝপথেই তাঁকে থামিয়ে দিয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের দিকে আঙুল তুলে ট্রাম্পের স্বভাবসুলভ হাসিমুখের টিপ্পনী. দিস গাই ইজ আ মনস্টার অ্যান্ড নোবডি নোজ হিম! অর্থাৎ, এ তো সাক্ষাৎ এক দৈত্য, অথচ কেউ একে চেনেও না!

মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের গম্ভীর আবহে হাসির ঝিলিক। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে পিচাইও পলকে ফিরিয়ে দিলেন বল। মুচকি হেসে খড়্গপুর আইআইটির প্রাক্তনী জবাব দিলেন, আশা করব, ভবিষ্যতে মনস্টার-এর চেয়ে আরও ভালো কোনও ট্যাগলাইন (Tagline) আমার কপালে জুটবে! মুহূর্তের এই চটজলদি রসবোধে জমে গেল সাংবাদিক বৈঠক। কিন্তু ট্রাম্পের মতো ছকভাঙা রাজনীতিকের মুখে এমন শব্দ কি কেবলই নিছক কৌতুক, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে সিলিকন ভ্যালি (Silicon Valley) ও ওয়াশিংটনের জটিল ক্ষমতার বিন্যাস?

প্রশংসার মোড়কে খোঁচা

মার্কিন কথ্যভাষা এবং বিশেষ করে কর্পোরেট পরিভাষায় ‘মনস্টার’ (Monster) কথাটি সবসময় নিন্দাসূচক নয়। বাণিজ্য ও প্রযুক্তির দুনিয়ায় বিপুল প্রতিপত্তি, আকাশছোঁয়া বাজারদর এবং অসীম পরিকাঠামোগত আধিপত্য বোঝাতেও বড় সংস্থাকে অনেকে দৈত্যাকার শক্তি বলে থাকেন। ট্রাম্প নিজেও কথার রেশ টেনে পরে স্পষ্ট করেন তাঁর বক্তব্য। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, সাধারণ মানুষ টেরও পায় না এঁরা ঠিক কতটা শক্তিশালী। রাজনীতিকদের প্রতিটি পদক্ষেপ নিয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে জবাবদিহি করতে হয়, অথচ পিচাইয়ের মতো প্রযুক্তি কর্তারা গোটা বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের মুঠোয় রেখেও প্রতিদিনের ক্যামেরার টানাপড়েন এড়িয়ে শান্তিতে রাজত্ব করেন।

আরও পড়ুন:  পানামায় ফের ৬ মাত্রার ভূমিকম্প, শতাধিক আফটারশকে বাড়ছে আতঙ্ক

পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, ট্রাম্পের এই মন্তব্য আসলে নিখুঁত এক ‘ব্যাকহ্যান্ডেড কমপ্লিমেন্ট’ (Backhanded Compliment)। একদিকে তিনি অ্যালফাবেটের মতো টেক-দানবের অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতার কথা যেমন স্বীকার করে নিলেন, তেমনই বুঝিয়ে দিলেন যে রাজনৈতিক ক্ষমতার অলিন্দে তাঁর মতো রাষ্ট্রনায়কদের সামনে এই টেক-কর্তারা প্রচারের আলোয় নিতান্তই সাদামাটা।

এআই রাজনীতির লড়াই

হোয়াইট হাউসের এই বিশেষ এআই মধ্যাহ্নভোজ (AI Lunch) নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎকার ছিল না। মধ্যাহ্নভোজের টেবিলে উপস্থিত ছিলেন কৃত্রিম মেধা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (Artificial Intelligence) দুনিয়ার অন্তত ৩০ জন হেভিওয়েট নিয়ন্ত্রক। পিচাই ছাড়াও সেখানে হাজির ছিলেন এনভিডিয়া-র (Nvidia) জেনসেন হুয়াং, টেসলা ও এক্সএআই-এর (xAI) প্রধান ইলন মাস্ক, মেটা-র (Meta) মার্ক জাকারবার্গ, প্যালান্টিয়ারের অ্যালেক্স কার্প এবং অ্যানথ্রপিক-এর (Anthropic) দারিও আমোদি।

বৈঠকের মূল আলোচ্য ছিল অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কৃত্রিম মেধার ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ কতটা থাকবে? আমোদিদের মতো কয়েকজন কর্তা যখন সুপার-ইন্টেলিজেন্সের ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ বিপদের কথা তুলে ধরে কিছুটা সতর্ক নিয়ন্ত্রণের পক্ষে সওয়াল করেছেন, তখন ট্রাম্প প্রশাসন সটান দাঁড়িয়েছে স্ব-নিয়ন্ত্রণের (Self-Policing / Self-Regulation) পক্ষে। ট্রাম্প স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছেন, ওয়াশিংটন এমন কোনও কঠোর আইনি বা লাইসেন্সিং খাঁড়া চাপাবে না যা মার্কিন সংস্থাগুলির হাত-পা বেঁধে দেয়। সংস্থাগুলি নিজেরাই অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনার মাধ্যমে সুরক্ষাবিধি তৈরি করবে।

আরও পড়ুন:  'আমরা তেল বিক্রি না করতে পারলে কেউ পারবে না', অপরিশোধিত তেল সরবরাহ নিয়ে হুমকি ইরানের

চিনের জুজু

হোয়াইট হাউসের এই অবস্থান বদলের নেপথ্যে কাজ করছে এক অদৃশ্য ভূরাজনৈতিক আতঙ্ক। তা হল কৃত্রিম মেধার বিশ্বমঞ্চে চিনের আগ্রাসন (US-China AI Race)। ট্রাম্পের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সোজাসাপটা। তিনি মনে করছেন, আমেরিকা যদি নিয়মের বেড়াজালে আটকে নিজেদের গবেষণার গতি মন্থর করে দেয়, তবে সেই শূন্যস্থান দ্রুত দখল করে নেবে বেজিং। ফলে জাতীয় নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক আধিপত্য ধরে রাখতে গেলে বিগ টেকের (Big Tech) এই ‘দৈত্য’দের ডানা ছাঁটা নয়, বরং তাঁদের অবাধে দৌড়তে দেওয়াই ওয়াশিংটনের প্রধান বাধ্যবাধকতা।

একই সঙ্গে সাধারণ নাগরিকদের সরকারি পরিষেবা নিমেষে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রশাসন প্রকাশ করেছে নতুন কেন্দ্রীয় কৃত্রিম মেধা প্ল্যাটফর্ম ‘আমেরিকা ডট গভ’ (America.gov)। ফলে সিলিকন ভ্যালির অ্যালগরিদম এখন সরাসরি মার্কিন প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গেই জুড়ে যেতে চলেছে।

তিক্ততা ভুলে নতুন সমীকরণ

একসময় গুগল-সহ বিগ টেক সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে ডেটা পক্ষপাত এবং একচেটিয়া কারবারের অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক জনসভায় গর্জে উঠতেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু নতুন বিশ্বব্যবস্থায় ছবিটা আমূল বদলে গিয়েছে। আজকের ডিজিটাল রণাঙ্গনে মার্কিন জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে ওয়াশিংটনের দরকার পিচাই, হুয়াং কিংবা মাস্কদের তৈরি উন্নত পরিকাঠামো ও আধুনিক চিপ। উল্টো দিকে আইনি গেরো ও অ্যান্টি-ট্রাস্ট নজরদারি এড়াতে টেক মহারথীদেরও প্রয়োজন প্রেসিডেন্টের সায়। পিচাইকে দেওয়া ট্রাম্পের এই ‘মনস্টার’ তকমা তাই বুঝিয়ে দিচ্ছে, আধুনিক পৃথিবীতে রাষ্ট্রনায়ক ও তথ্যপ্রযুক্তি সম্রাটদের সম্পর্ক সংঘাতের নয়, বরং পারস্পরিক স্বার্থের এক জটিল ও অনিবার্য আঁতাতের।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment