ইউরোপের একের পর এক দেশে জীবনযাত্রার ব্যয়, বাসস্থানের সঙ্কট ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। স্পেন ও ফ্রান্সে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভের আবহে এ বার ইতালির মিলানেও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ালেন প্রতিবাদীদের একাংশ। অন্য দিকে, পর্তুগালের লিসবনে বাড়ি ভাড়া ও জীবনযাত্রার খরচ কমানোর দাবিতে তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কয়েকশো বিক্ষোভকারী। আলবেনিয়াতেও সরকারবিরোধী আন্দোলন হিংসাত্মক হয়ে উঠেছে। দেশগুলিতে বিক্ষোভের তাৎক্ষণিক কারণ আলাদা হলেও, সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এই আন্দোলনগুলির গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট।
দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার লিসবনে হাজার হাজার মানুষ মিছিলে অংশ নেন। তাঁদের দাবির কেন্দ্রে ছিল বাড়ির আকাশছোঁয়া দাম, ভাড়া বৃদ্ধি, কম মজুরি এবং জীবনযাত্রার খরচ। মিছিলের পরে রাজধানীর ব্যস্ত রসিও স্কোয়ারে তাঁবু খাটিয়ে রাত কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন কয়েকশো বিক্ষোভকারী। তাঁদের দাবি, আবাসন সঙ্কট মোকাবিলায় সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ করতে হবে।
৪৬ বছরের সামাজিক সহায়তাকর্মী এলেনা কোস্তা দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, ‘পর্তুগালের যে সামাজিক শ্রেণি কর দেয়, যে শ্রেণি দেশটাকে চালিয়ে নিয়ে যায়, তারাই এখন আক্রমণের মুখে। তারা নিজেদের অধিকার হারাচ্ছে, বিশেষ করে বাসস্থানের অধিকার।’ তাঁর কথায়, ‘আমরা সবাই এখানে একসঙ্গে এসেছি, বোঝাতে যে আমাদের দমবন্ধ হয়ে আসছে।’
পর্তুগালে আবাসন সঙ্কট কতটা গভীর, তা বোঝা যায় বাড়ির দামের পরিসংখ্যানেই। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে দেশে বাড়ির দাম বেড়েছে ১২৪ শতাংশ— ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় বৃদ্ধির প্রায় দ্বিগুণ। এর প্রভাব বিশেষ করে পড়েছে তরুণদের উপর এবং লিসবনের মতো বড় শহরে। পর্তুগালের ১ কোটি ১০ লক্ষের বেশি মানুষের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বাস করেন লিসবন ও তার আশপাশের মহানগর এলাকায়। ফলে কাজ বা পড়াশোনার জন্য শহরে আসা বহু মানুষের পক্ষে সাশ্রয়ী বাসস্থান খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
৫২ বছরের ইঞ্জিনিয়ার আন্তোনিও মারগাদো পর্তুগালের কেন্দ্র-ডানপন্থী সরকারের আবাসন নীতির সমালোচনা করেন। তাঁর অভিযোগ, ‘ভাড়ার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ উদারীকরণের নীতি নেওয়া হয়েছে। বাড়ির মালিকেরা ক্রমশ বেশি সুরক্ষা পাচ্ছেন, অথচ যাঁদের বাড়ি প্রয়োজন, সেই ভাড়াটেরাই ক্রমশ কম সুরক্ষা পাচ্ছেন।’
শনিবারের লিসবনে হওয়া শিবিরটি অবশ্য পর্তুগালে আবাসন সঙ্কট নিয়ে চলা বৃহত্তর প্রতিবাদেরই অংশ। এর আগে সে দেশের পোর্তোয় কয়েক ডজন তাঁবু খাটিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা। পর্তুগালের বৃহত্তম শ্রমিক সংগঠন CGTP-র ডাকা মিছিলেও আবাসন সঙ্কটের পাশাপাশি উন্নত সরকারি পরিষেবা, পেনশন ও মজুরির দাবিতে সরব হন বিক্ষোভকারীরা।
ইটালির মিলানে শনিবার জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে মিছিল শুরু হয়েছিল শান্তিপূর্ণ ভাবেই। কিন্তু পরে মুখ ঢাকা কয়েকজন বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে পাথর, রাস্তার পাথরের চাঁই ও অন্যান্য বস্তু ছুড়তে থাকেন। রাস্তার টেবিল দিয়ে তৈরি ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। সংঘর্ষে অন্তত দু’জন পুলিশকর্মী আহত হন। সংবাদ সংস্থা LaPresse-র খবর অনুযায়ী, বহু নাবালক-সহ প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। সংঘর্ষের পরে পুলিশের একটি গাড়ি গুরুতর ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় দেখা যায়।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সমাজমাধ্যমে লেখেন, বিক্ষোভ দেখানো মানুষের অধিকার হলেও ‘আমাদের শহরগুলিতে আগুন লাগানো’ কোনও অধিকার হতে পারে না। তাঁর অভিযোগ, কিছু ‘দুষ্কৃতী’ প্রতিবাদকে কাজে লাগিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের আক্রমণ করেছে এবং গোটা শহরকে অশান্ত করে রাখার চেষ্টা করেছে।
ইউরোপের এই ক্ষোভ এক দিনে তৈরি হয়নি। গত মাসে স্পেনে আবাসন সঙ্কট নিয়ে তীব্র বিক্ষোভ শুরু হয়। ৮৭ বছরের মারিয়া দেল কারমেন আবাসকালের ফ্ল্যাট কিনেছিল একটি বিনিয়োগকারী সংস্থা। সংস্থাটি তাঁর ভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়াতে চেয়েছিল। সেই বর্ধিত ভাড়া দিতে না পারায় তাঁকে বাড়ি ছাড়তে হয়। পরে তাঁর মৃত্যু এবং উচ্ছেদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবাসন সঙ্কট ও সামাজিক বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ আরও জোরালো হয়।
মাদ্রিদের কেন্দ্রে প্রতিবাদী শিবির তৈরি হয়। ভাড়াটেদের সুরক্ষা ও বাসস্থানের অধিকার নিশ্চিত করতে স্পেনের সমাজতান্ত্রিক নেতৃত্বাধীন সরকার জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তাব আনে। কিন্তু সংসদে দক্ষিণপন্থী ও অতি-দক্ষিণপন্থী দলগুলি সেই প্রস্তাব আটকে দেয়। এর পর প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ নভেম্বরের শেষ দিকে আগাম সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা করেন। তাঁর বক্তব্য, প্রস্তাবিত আইন পাশ করাতে সরকারের আরও বিস্তৃত প্রগতিশীল সমর্থন প্রয়োজন।
ফ্রান্সে বিক্ষোভের সূত্রপাত স্কুলের অব্যবস্থা নিয়ে। প্যারিসের উত্তরের দরিদ্র উপশহরগুলির স্কুলে শিক্ষকের অভাব, নিয়মিত ক্লাস না হওয়া এবং পরিকাঠামোর দুরবস্থা নিয়ে পড়ুয়া ও অভিভাবকদের ক্ষোভ ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে। পরে সেই অসন্তোষ বৈষম্য, সরকারি খাতে কম খরচ এবং পরিষেবার মান নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনের সঙ্গে মিশে যায়।
শনিবার উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পড়ুয়াদের সমর্থনে হওয়া বিক্ষোভের একাংশ পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। কিছু জায়গায় ভবনে আগুন লাগানো ও দোকান লুটের ঘটনাও ঘটে। দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে দিন ফ্রান্সে ১,২০০-র বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়। তবে সব বিক্ষোভকারী হিংসায় জড়িত ছিলেন, এমন দাবি প্রতিবেদনে করা হয়নি।
আলবেনিয়াতেও কয়েক মাস ধরে চলা সরকারবিরোধী ক্ষোভ শনিবার নতুন করে হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি ও বেশি টিউশন ফি নিয়ে ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ দাবি করেন। প্রতিবাদ চলাকালীন পুলিশের দিকে পাথর, পেট্রোল বোমা, ধাতব বস্তু ও আতশবাজি ছোড়া হয়। গাড়ি ও ময়লার পাত্রে আগুন লাগিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে পুলিশ প্রথমবারের মতো বিক্ষোভকারীদের দিকে রাবার বুলেট ছোড়ে বলে জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। রাত পর্যন্ত চলা অশান্তিতে আদালত, ব্যাঙ্ক ও ডাকঘর-সহ একাধিক ভবনে আগুন লাগানো হয় বা সেগুলি গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্দোলনের প্রাথমিক সূত্রগুলির মধ্যে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ ওঠা একটি বিতর্কিত রিসর্ট প্রকল্প। তবে আলবেনিয়ার বিক্ষোভের পিছনে দীর্ঘদিন ধরে জমা হওয়া সরকারবিরোধী অসন্তোষও বড় কারণ।
বিভিন্ন দেশের প্রতিবাদের কারণ এক নয়। কোথাও বাড়ি ভাড়া ও জীবনযাত্রার খরচ, কোথাও স্কুল-কলেজের অবস্থা, কোথাও সরকারি নীতি ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। কিন্তু এই দাবিগুলির মধ্যে একটি সাধারণ যোগসূত্র রয়েছে। তা হলো বহু মানুষের মনে হচ্ছে, কাজ করেও তাঁরা ন্যূনতম নিরাপত্তা ও স্বচ্ছন্দ জীবনযাপন নিশ্চিত করতে পারছেন না। তরুণদের কাছে পড়াশোনা ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না, শহরে কাজের সুযোগ থাকলেও সেখানে থাকার খরচ সামলানো কঠিন হয়ে উঠছে, আর সরকারি পরিষেবার দুর্বলতা সেই অনিশ্চয়তা আরও বাড়াচ্ছে।
এই পরিস্থিতি ষাটের দশকের, বিশেষ করে ১৯৬৮ সালের ফ্রান্সের ছাত্র আন্দোলন ও শ্রমিক ধর্মঘটের কথা মনে করিয়ে দিতে পারে। সে সময় ছাত্রদের অসন্তোষ বৃহত্তর শ্রমিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল এবং দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার উপর চাপ তৈরি করেছিল। বর্তমান ইউরোপেও বিভিন্ন সামাজিক অসন্তোষ একসঙ্গে সামনে আসছে, তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ছে এবং সরকারের নীতির উপর চাপ তৈরি হচ্ছে। তবে আজকের বিক্ষোভগুলিকে ১৯৬৮ সালের আন্দোলনের সরাসরি পুনরাবৃত্তি বলা যাবে না। দেশভেদে তাদের দাবি, নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আলাদা।
ইউরোপের সরকারগুলির সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ— একদিকে হিংসা ও ভাঙচুর ঠেকানো, অন্যদিকে যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলি মানুষকে রাস্তায় নামাচ্ছে, সেগুলির বাস্তব সমাধান খোঁজা। শুধু পুলিশের মাধ্যমে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করলে ক্ষোভের কারণগুলির সুরাহা হবে না। আবার জনরোষের নামে হিংসা ও সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনাও সাধারণ মানুষের দাবিকে দুর্বল করতে পারে। ইউরোপের এই আন্দোলন শেষ পর্যন্ত কত দূর গড়াবে, তা নির্ভর করবে সরকারগুলি জীবনযাত্রার খরচ, বাসস্থান, শিক্ষা ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে জমে থাকা অসন্তোষের জবাব কতটা দিতে পারে, তার উপর। -Eisamay
Leave a Comment