বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) বুধবার দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অফ সাউথ এশিয়া (Foreign Correspondents’ Club of South Asia)-র এক ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে দীর্ঘ বক্তব্য রাখেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর এই প্রথম প্রকাশ্য মঞ্চ থেকে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা জানান। বক্তৃতার শুরুতেই তিনি বলেন, “আমি মুজিব কন্যা বলছি। আমাকে জেলে পাঠানো হতে পারে, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হতে পারে। তবুও আমি বাংলাদেশে ফিরব, দেশের মানুষের জন্য ফিরব।”
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের ঘটনাকে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা দাবি করেন, সে সময়ের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ছিল না এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তাঁর সরকার আলোচনার পথও নিয়েছিল। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোটা ব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কের সময় সরকার কয়েকটি দাবি মেনে নেয় এবং মন্ত্রীদের মাধ্যমে আলোচনার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তীকালে আন্দোলনের চরিত্র বদলে যায় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
শেখ হাসিনা আরও দাবি করেন, ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি ও শিল্পক্ষেত্রে অবনতি হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, শিল্প উৎপাদন কমেছে, বিনিয়োগে প্রভাব পড়েছে এবং বহু ব্যবসায়ী দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। পাশাপাশি তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের আর্থিক নীতির ফলেও দেশের অর্থনীতি চাপে রয়েছে।
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী আরও অভিযোগ করেন, ছাত্র আন্দোলনের সময় মৃত্যুর ঘটনাগুলি তদন্তের জন্য তাঁর সরকার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল। তবে ক্ষমতা পরিবর্তনের পর সেই তদন্ত এগোতে দেওয়া হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন। এছাড়া আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও তাঁর অভিযোগ।
অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় (Sajeeb Wazed Joy)। তিনি বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং আন্তর্জাতিক মহলের নজর আকর্ষণের আহ্বান জানান। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের কয়েকজন প্রাক্তন মন্ত্রী ও জনপরিচিত ব্যক্তিত্বও যুক্ত ছিলেন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে গণহত্যাসহ একাধিক মামলার বিচারপ্রক্রিয়া চলছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে আদালতের নির্দেশও রয়েছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা ও তাঁর দল আওয়ামী লীগ (Awami League) বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে এবং এগুলিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে। ফলে এদিনের বক্তৃতায় তাঁর করা অভিযোগ ও বক্তব্যগুলিও তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে বিবেচিত।
এদিকে অনুষ্ঠানের আগে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক (Ministry of External Affairs) স্পষ্ট করে জানিয়েছিল, এটি একটি বেসরকারি সংস্থার আয়োজন এবং ভারত সরকারের সঙ্গে এই অনুষ্ঠানের কোনও সম্পর্ক নেই। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল (Randhir Jaiswal) বলেন, অনুষ্ঠানে যে মতামত প্রকাশ করা হবে, তা সরকারের অবস্থানকে প্রতিফলিত করে না।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক, সীমান্ত পরিস্থিতি, আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনার এই বক্তব্য তাৎপর্যপূর্ণ। তবে তিনি দেশে ফিরতে পারবেন কি না বা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তাঁর বক্তব্য কী প্রভাব ফেলবে, তা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ও আইনি পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে।
Leave a Comment