উত্তাল হয়ে উঠেছে পাক অধিকৃত কাশ্মীর [Pakistan-occupied Kashmir, PoK]। বুধবার রাওয়ালাকোট থেকে রাজধানী মুজফফরাবাদের উদ্দেশে ঘোষিত লংমার্চ ঘিরে ইসলামাবাদ যে ভাবে গোটা এলাকায় নিরাপত্তা বলয়ে ঘিরেছে, তা নিয়ে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে গোটা উপমহাদেশে। বিক্ষোভ সংগঠিত করছে জাক [Joint Awami Action Committee, JAAC] নামে একটি নাগরিক অধিকার সংগঠন, যাকে ইতিমধ্যেই সন্ত্রাসদমন আইনে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে পাকিস্তান সরকার। মার্চ ঠেকাতে রাওয়ালাকোট কার্যত অবরুদ্ধ। অতিরিক্ত চার হাজার রেঞ্জার্স, পুলিশ এবং ফ্রন্টিয়ার কনস্টেবুলারি বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে, যা আগে থেকেই মোতায়েন থাকা প্রায় ষোলো হাজার নিরাপত্তারক্ষীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বুধবার নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে জনতার সংঘর্ষে অন্তত ১২ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে, যার মধ্যে রয়েছেন দুই নিরাপত্তারক্ষীও।
কেন পথে প্রতিবাদ
জেএসি-র আন্দোলনের মূলে রয়েছে আটত্রিশ দফা দাবি। এই তালিকার শীর্ষে আছে পাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তুদের জন্য পিওকে বিধানসভায় সংরক্ষিত বারোটি আসন বাতিলের দাবি। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই সংরক্ষিত আসনগুলিকে ব্যবহার করে ইসলামাবাদের অনুগত নেতাদের বসিয়ে দেওয়া হয় ক্ষমতায়, যার জেরে প্রকৃত স্থানীয় প্রতিনিধিদের বঞ্চিত করা হয়। এ ছাড়াও বিদ্যুতের চড়া মাসুল কমানো, ভর্তুকিযুক্ত গম ও আটার দাম নিয়ন্ত্রণ, মন্ত্রী ও আমলাদের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা বন্ধ করা এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার মতো একাধিক অর্থনৈতিক দাবি রয়েছে আন্দোলনকারীদের। উল্লেখ্য, অঞ্চলটিতে ঝিলম নদীর উপর মাঙলা বাঁধের মতো বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে পাকিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ হলেও, স্থানীয়দের অভিযোগ, তাঁরাই সবচেয়ে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে বাধ্য হন।
ক্রমবর্ধমান দমনপীড়ন
জুন মাসের গোড়া থেকেই এই বিক্ষোভ জোরালো আকার নেয়। জুনের প্রথম সপ্তাহে রাওয়ালাকোটের ইদগাহ ময়দানে বিশাল জমায়েতের উপর গুলি চালানোর অভিযোগ ওঠে পাক রেঞ্জার্স ও সেনার বিরুদ্ধে, সেই সংঘর্ষে প্রাণ হারান বেশ কয়েকজন। এর পরেই জেএসি-কে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে ইসলামাবাদ, ছয়শোরও বেশি কর্মী-সমর্থককে গ্রেফতার করা হয় বলে খবর। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইতিমধ্যেই এই নিষেধাজ্ঞাকে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংগঠনের উপর অনভিপ্রেত আঘাত বলে সমালোচনা করেছে।
রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, মৃত্যুমিছিল
মুজফফরাবাদ অভিযানের ঠিক আগে সুধনোতি জেলার বালোচ বৈঠক এলাকায় প্রায় সাড়ে চারশো রেঞ্জার্সের একটি কনভয় আটকে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে, তার পরেই শুরু হয় গুলি বিনিময়। প্রশাসনের দাবি, এই সংঘর্ষে সাত জন বিক্ষোভকারী ও এক পুলিশ কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। রাওয়ালাকোটেও নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধ বাধে জনতার, যাতে প্রাণ হারান এক রেঞ্জার্সকর্মী। গত কয়েক সপ্তাহের অস্থিরতা ও তার পরবর্তী দমনপীড়নে মোট মৃতের সংখ্যা ২৮ বলে জানাচ্ছে স্থানীয় সূত্র, যার মধ্যে রয়েছেন পাঁচ জন পুলিশ কর্মী। তবে ঘটনাস্থলে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় স্বাধীনভাবে এই পরিসংখ্যান যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলেও জানাচ্ছে একাধিক সংবাদমাধ্যম।
নির্বাচনের মুখে কেন এই অস্থিরতা
আগামী ২৭ জুলাই পিওকে বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা, ঠিক তার আগে এমন ব্যাপক অস্থিরতা ইসলামাবাদের জন্য অস্বস্তিকর বলেই মনে করছে কূটনৈতিক মহল। বিশ্লেষকদের একাংশের ব্যাখ্যা, বারবার আলোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা রক্ষা না করার পুরনো অভ্যাসেই এ বার ইসলামাবাদের উপর আস্থা হারিয়েছেন জেএসি নেতৃত্ব। ফলে সমঝোতার রাস্তা ছেড়ে সরাসরি রাজধানী অভিযানের পথ বেছে নিয়েছেন তাঁরা।
নয়াদিল্লির প্রতিক্রিয়া
ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সাপ্তাহিক সাংবাদিক বৈঠকে এই বিক্ষোভ প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে জানিয়েছেন, পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের শোষণ, মৌলিক অধিকার হরণ এবং প্রশাসনিক দমননীতিরই স্বাভাবিক পরিণতি এই আন্দোলন। তাঁর অভিযোগ, স্থানীয় মানুষের যুক্তিযুক্ত দাবিদাওয়ার সুরাহা না করে বরং নারী ও শিশুদের উপরেও বলপ্রয়োগ করেছে পাকিস্তান প্রশাসন, খাদ্য-ওষুধের মতো জরুরি সরবরাহ আটকে দেওয়া হয়েছে এবং ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহলকে এই বিষয়ে পাকিস্তানের জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বানও জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
Leave a Comment