নজরবন্দি ব্যুরো: বিহারের বাঁকিপুর (Bankipur) বিধানসভা উপনির্বাচনের ফল শুধু একটি আসনের জয়-পরাজয়ের গল্প নয়, বরং রাজ্যের দীর্ঘদিনের জাতপাতভিত্তিক ভোট-সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত। প্রশান্ত কিশোর (Prashant Kishor)-এর নেতৃত্বাধীন জন সুরাজ পার্টির এই জয় দেখিয়ে দিল, অন্তত এই নির্বাচনে ভোটারদের একাংশ পরিচিত রাজনৈতিক অঙ্কের বাইরে গিয়ে নতুন বার্তা দিয়েছেন। বিশেষ করে বিজেপির দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিতে এমন ফল স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিহারের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে জাতিগত ভোটব্যাঙ্ককে কেন্দ্র করেই নির্বাচনী সমীকরণ গড়ে উঠেছে। বলিউডের চিত্রনাট্যকার ও কৌতুকশিল্পী বরুণ গ্রোভার (Varun Grover) কয়েক বছর আগে এক আলোচনায় ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, বিহার-উত্তরপ্রদেশে জাতপাতের হিসাব ছাড়া ভোটের রাজনীতি কল্পনা করাই কঠিন। বাঁকিপুরের ফল সেই প্রচলিত ধারণাকেই নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
গত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাঁকিপুরকে বিজেপির অন্যতম নিরাপদ আসন হিসেবে ধরা হত। রাজধানী পটনা (Patna)-র এই কেন্দ্রে কায়স্থ ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ভূমিহার, রাজপুত, ব্রাহ্মণ ও বানিয়া সম্প্রদায়ের ভোটও বিজেপির অন্যতম শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। পটনা সাহিব (Patna Sahib) লোকসভা কেন্দ্রেও দীর্ঘদিন বিজেপির প্রভাব ছিল স্পষ্ট।
এই কেন্দ্রে আগে বিজেপির হয়ে জয়ী হয়েছেন শত্রুঘ্ন সিন্হা (Shatrughan Sinha) এবং রবিশঙ্কর প্রসাদ (Ravi Shankar Prasad)-এর মতো কায়স্থ নেতারা। বিদায়ী বিধায়ক তথা বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন (Nitin Nabin)-ও কায়স্থ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি। ফলে বাঁকিপুরে বিজেপির সামাজিক ভিত্তি অত্যন্ত শক্ত বলেই মনে করা হত।
জনসংখ্যার নিরিখে এই কেন্দ্রে প্রায় ১৪ শতাংশ কায়স্থ ভোটারের পাশাপাশি যাদব, মুসলিম, চন্দ্রবংশী, বানিয়া, দলিত, ভূমিহার, ব্রাহ্মণ, রাজপুত, কুর্মি এবং কুশওয়াহা ভোটারদেরও উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। এত বৈচিত্র্যময় সামাজিক সমীকরণের মধ্যেও এতদিন বিজেপি নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছিল।
কিন্তু এবারের ফল সম্পূর্ণ ভিন্ন ছবি তুলে ধরেছে। প্রশান্ত কিশোর প্রায় ৪৯ শতাংশেরও বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। অন্যদিকে বিজেপির ভোট নেমে এসেছে প্রায় ৩৪ শতাংশে। রাষ্ট্রীয় জনতা দল (Rashtriya Janata Dal) বা আরজেডি ১১ শতাংশেরও কম ভোট পেয়েছে। অর্থাৎ লড়াই মূলত বিজেপি বনাম প্রশান্ত কিশোরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, বিজেপির প্রচলিত উচ্চবর্ণ ভোটের একটি বড় অংশ এবার জন সুরাজের দিকে ঝুঁকেছে। কারণ হিসেবে উঠে আসছে একাধিক বিষয়। প্রথমত, শেষ মুহূর্তে প্রার্থী বদলে নীরজ কুমার (Neeraj Kumar)-কে প্রার্থী করা বিজেপির সংগঠনের একাংশের মধ্যেই অস্বস্তি তৈরি করেছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কায়স্থ সম্প্রদায়ের হলেও তাঁকে নিয়ে স্থানীয় স্তরে প্রত্যাশা তৈরি হয়নি বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মত।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে মুখ্যমন্ত্রী পদের নেতৃত্বের প্রশ্ন। বিজেপি জোটে নেতৃত্বের পরিবর্তনের পর উচ্চবর্ণ ভোটারদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের দাবি। দীর্ঘদিন নীতীশ কুমার (Nitish Kumar) এনডিএ-র বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতেন। সেই সমীকরণ দুর্বল হওয়ার প্রভাব বাঁকিপুরে পড়েছে বলেও মত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
আরও একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। প্রশ্নফাঁস-বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, বিশেষ করে পটনা (Patna)-য় তরুণদের সক্রিয় অংশগ্রহণ, নতুন প্রজন্মের ভোটের উপর কিছুটা প্রভাব ফেলেছে বলে বিভিন্ন মহলের দাবি। ওই আন্দোলনে অংশ নেওয়া বহু যুবক-যুবতী প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলির বাইরে বিকল্প নেতৃত্বের সন্ধান করেছেন বলেও অনুমান করা হচ্ছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রশান্ত কিশোর শুরু থেকেই প্রকাশ্যে জাতপাতভিত্তিক রাজনীতির বদলে প্রশাসন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং উন্নয়নকে সামনে আনার চেষ্টা করেছেন। সেই কারণে উচ্চবর্ণ ভোটের পাশাপাশি ওবিসি, ইবিসি, দলিত এবং মুসলিম ভোটের একটি অংশও তাঁর দিকে যেতে পারে বলে প্রাথমিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
বাঁকিপুরের এই ফলাফল আপাতত একটি উপনির্বাচনের সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তবে এটি বিহারের ভবিষ্যৎ রাজনীতির নতুন ইঙ্গিত কি না, তা আগামী নির্বাচনের ফলই বলবে। তবুও একটি বিষয় স্পষ্ট— দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত ভোট-সমীকরণ যে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, বাঁকিপুর সেই বার্তাই রাজনৈতিক মহলের সামনে তুলে ধরেছে।
Leave a Comment