সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের নাম নেই। প্রতীকও নেই, তাহলে দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থাকবে কী করে? আর উল্টোদিকে প্রশ্ন, নাম ও প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের জেরে কি একটি রাজনৈতিক সংগঠনের দৈনন্দিন জীবন থমকে যাবে? এই দুই প্রশ্নের টানাপড়েনেই কলকাতা হাইকোর্টে তুঙ্গে উঠল তৃণমূল কংগ্রেসের তিন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ঘিরে হওয়া মামলা।
নির্বাচন কমিশনের ১৭ সেপ্টেম্বরের অন্তর্বর্তী নির্দেশে ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও প্রতীক ব্যবহারে বিধিনিষেধ আসে। তারপরেই রাজ্যের যুক্তি, যে তিনটি অ্যাকাউন্ট চালানোর অনুমতি চাওয়া হয়েছে, সেগুলি ওই নামেই পরিচালিত। ফলে কমিশনের নির্দেশের পরে এই আবেদন আর চালানো যায় না। মামলাটি কার্যত গুরুত্বহীন।
কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষের প্রবীণ আইনজীবী শোয়েব আলমের সওয়াল, দলের প্রতীক নিয়ে লড়াই আর একটি সংগঠনের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট চালানো, দুটি বিষয় এক নয়। তাঁর যুক্তি, নির্বাচন কমিশনের প্রতীক সংক্রান্ত এক্তিয়ারকে ব্যবহার করে কোনও রাজনৈতিক সংগঠনের সম্পত্তি বা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পরিচালনার অধিকার কেড়ে নেওয়া যায় না।
আদালতে উঠে আসে সংবিধানের ১৯(১)(c)-এর কথাও। আলমের বক্তব্য, সংগঠন করার সাংবিধানিক অধিকার থেকেই রাজনৈতিক সংগঠনের অস্তিত্বের প্রশ্ন আসে। ৯ জুলাইয়ের অন্তর্বর্তী নির্দেশেও দৈনন্দিন দলীয় খরচ মেটাতে তিনটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
সেখানে বিচারপতির কড়া প্রশ্ন, ‘শেষ পর্যন্ত যদি নামই না থাকে?’ অর্থাৎ, নির্বাচন কমিশন যদি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে মমতা-পক্ষকে ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম বা প্রতীক ব্যবহারের অধিকার না দেয়, তাহলে সেই পক্ষকে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট চালানোর অনুমতি দেওয়ার যৌক্তিকতা কোথায়? আদালতের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট হয়, শুধু নাম-প্রতীকের প্রশ্ন থেকে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের ভবিষ্যৎকে সম্পূর্ণ আলাদা করে দেখা সহজ নয়।
রাজ্যের এএজি রাজদীপ মজুমদারের বক্তব্য, কমিশনের অন্তর্বর্তী নির্দেশ দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই তৃণমূলের নাম ও প্রতীক ব্যবহারে বিধিনিষেধ এনেছে। ভবিষ্যতে কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অন্য কোনও গোষ্ঠীর পক্ষে গেলে তার আগে মমতা-পক্ষকে অ্যাকাউন্ট চালানোর সুযোগ দেওয়ার পরিণতি কী হবে সেই প্রশ্নও আদালতের সামনে।
পাল্টা আলমের যুক্তি, সুপ্রিম কোর্টের নজির অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন প্রতীক নিয়ে বিরোধ মেটাতে পারে। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর সম্পত্তি নিয়ে চূড়ান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির এক্তিয়ার তার নেই। সেই প্রশ্ন দেওয়ানি আদালতে যেতে পারে। শুনানিতে পুলিশ কর্তৃপক্ষের রিপোর্ট এবং বিশেষ আধিকারিকের সিল করা রিপোর্টও আদালতে জমা পড়ে। আদালত সেগুলি নথিভুক্ত করেছে।
রাজ্যের আপত্তি ছিল যে উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে কমিশনের অন্তর্বর্তী নির্দেশ সেটি তো প্রায় দশ দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। তা হলে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট পরিচালনার অন্তর্বর্তী নির্দেশ এত দীর্ঘ সময়ের জন্য কেন? শেষ পর্যন্ত আদালত ৯ জুলাইয়ের অন্তর্বর্তী নির্দেশের মেয়াদ ২৯ জানুয়ারি, ২০২৭ পর্যন্ত অথবা পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়। তবে সেই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ স্পষ্টীকরণ, এই মেয়াদ বাড়ানোর অর্থ মমতা-পক্ষকে ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম বা দলীয় প্রতীক ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া নয়।
আপাতত ব্যাঙ্ক চলবে। কিন্তু নাম-প্রতীকের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিতই। একদিকে দলের দৈনন্দিন খরচ, সংগঠনের অস্তিত্ব ও ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সচল রাখার প্রশ্ন। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের নাম-প্রতীক সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী নির্দেশ এবং চূড়ান্ত স্বীকৃতির অপেক্ষা। তৃণমূলের এই আইনি লড়াইয়ে আপাতত চারটি সুতো একই জায়গায় এসে জড়িয়ে গেল। আদালতের নির্দেশে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে আপাতত তালা পড়ল না। কিন্তু ‘তৃণমূল’ নাম ও প্রতীকের চাবি এখনও নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
Leave a Comment