বেঙ্গল সাফারির ছোঁয়া জঙ্গলমহলেও: ঝাড়গ্রামে এবার হাজার একরের মুক্ত চিড়িয়াখানা, ঘুরে বেড়াবে বাঘ

By Suman Debnath

July 15, 2026 10:40 PM

বেঙ্গল সাফারির ছোঁয়া জঙ্গলমহলেও: ঝাড়গ্রামে এবার হাজার একরের মুক্ত চিড়িয়াখানা, ঘুরে বেড়াবে বাঘ


উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স ঘেঁষা শিলিগুড়ির বেঙ্গল সাফারি পার্কের অরণ্যরোমাঞ্চ এ বার পাড়ি দিচ্ছে দক্ষিণবঙ্গের লালমাটির দেশে। জঙ্গলমহলের প্রাণকেন্দ্র ঝাড়গ্রামে প্রায় হাজার একর জায়গা জুড়ে তৈরি হতে চলেছে এক বিশাল মুক্ত চিড়িয়াখানা ও টাইগার সাফারি পার্ক। প্রাথমিক পরিকল্পনা, যেখানে খাঁচার বদলে বাঘ-হরিণ-ভাল্লুকের মতো বন্যপ্রাণীরা ঘুরে বেড়াবে অনেকটা খোলা আকাশের নীচে। শিলিগুড়ির বেঙ্গল সাফারি থেকেই এই নতুন প্রকল্পে প্রাণী সরবরাহ করা হবে বলে বন দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে।

জঙ্গলমহলে নতুন

বুধবার শিলিগুড়ির বেঙ্গল সাফারি পার্ক ঘুরে দেখেন রাজ্যের বনমন্ত্রী মনোজ ওরাওঁ। সঙ্গে ছিলেন অর্থ ও পরিবহণ প্রতিমন্ত্রী আনন্দময় বর্মন, স্থানীয় বিধায়িক শিখা চট্টোপাধ্যায় এবং বন দপ্তরের শীর্ষ কর্তা সন্দীপ সুন্দরিয়াল ও ভাস্কর জে ভি। পরিদর্শন শেষে মন্ত্রী এটিকে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও বৃহত্তম সাফারি পার্ক বলে উল্লেখ করেন। তবে যথাযথ প্রচারের অভাবে এত বড় মাপের একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র বহু বছর ধরে আড়ালেই থেকে গিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এর জন্য পূর্বতন রাজ্য সরকারের নীতিকেই দায়ী করেন। উল্লেখ্য, ঝাড়গ্রামে ১৯৮০ সালে হরিণ উদ্যান হিসেবে যাত্রা শুরু করা ছোট্ট চিড়িয়াখানাটি ২০১৪ সালে জঙ্গলমহল জ়লজিক্যাল পার্ক নাম নিয়ে পূর্ণাঙ্গ চিড়িয়াখানার স্বীকৃতি পায়। এ বার সেই পরিসরকেই বিপুল ভাবে সম্প্রসারিত করে এক হাজার একরের সাফারি পার্কে রূপায়িত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বেঙ্গল সাফারিতেও নতুন চমক

শুধু ঝাড়গ্রামের নতুন প্রকল্পই নয়, শিলিগুড়ির মূল পার্কটিকেও আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে একগুচ্ছ পরিকল্পনা রয়েছে বন দপ্তরের। বাঘ, হরিণ, ভাল্লুকের পাশাপাশি আসছে সিংহও। শীঘ্রই নির্দিষ্ট ঘেরাটোপে জঙ্গলের রাজার বিচরণ দেখতে পাবেন দর্শকরা। শিলিগুড়ির পার্কে বন্যপ্রাণীদের প্রজনন কর্মসূচি যথেষ্ট সাফল্য পেয়েছে। আর সেই সফল অভিজ্ঞতাকেই ভিত্তি করে গড়ে তোলা হবে ঝাড়গ্রামের নতুন সাফারি, যেখানে বাঘ-সহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী মূলত বেঙ্গল সাফারি থেকেই পাঠানো হবে।
শূন্যপদের সংকট, সমাধানে উদ্যোগী প্রশাসন
বন দপ্তরের পরিকাঠামোগত সংকটের কথাও উঠে এসেছে এই পরিদর্শনে। দপ্তরের প্রায় ৮০ থেকে ৮৭ শতাংশ পদ বর্তমানে শূন্য, যার জন্য পূর্ববর্তী সরকারের নীতিকে দায়ী করা হয়েছে। বনাঞ্চল সুরক্ষা এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলির সুষ্ঠু পরিচালনার স্বার্থে এই শূন্যপদ পূরণকে অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে বর্তমান সরকার, এবং সমস্ত আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া মেনে দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর কথা জানানো হয়েছে।

আরও পড়ুন:  ইতিহাসে প্রথম, সাসপেন্ড হল বিধানসভার মার্শাল

ইকো সেনসিটিভ জোন

উত্তরবঙ্গের বনাঞ্চল লাগোয়া এলাকার বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার।গ্রিন ট্রাইব্যুনালের নির্দেশিকা অনুযায়ী বনাঞ্চলের সীমানা থেকে আগে যে ইকো সেনসিটিভ জোনের পরিধি ৫ কিলোমিটার পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল, তা কমিয়ে মাত্র এক কিলোমিটার করার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। শিলিগুড়ি স্টেট গেস্ট হাউসে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বনমন্ত্রী মনোজ ওরাওঁ, দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা, পর্যটনমন্ত্রী শঙ্কর ঘোষ, প্রতিমন্ত্রী আনন্দময় বর্মন, বিধায়ক শিখা চট্টোপাধ্যায় এবং বন দপ্তরের শীর্ষ আধিকারিকদের উপস্থিতিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশেই এই পদক্ষেপ বলে জানিয়েছেন বনমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, জনস্বার্থ এবং বন্যপ্রাণ সুরক্ষা, দুই দিকই মাথায় রেখে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। ৫ কিলোমিটার পরিধির বাধ্যবাধকতার জেরে শিলিগুড়ি-সহ সংলগ্ন এলাকায় সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন পরিকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প দীর্ঘদিন আইনি জটিলতায় থমকে ছিল। সেই সমস্যা মাথায় রেখেই এই পরিধি কমানোর প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। শীঘ্রই এই বিষয়ে একটি খসড়া নির্দেশিকা প্রকাশ করা হবে, তার পরেই কার্যকর হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।

আরও পড়ুন:  জোকা–এসপ্ল্যানেড মেট্রো প্রকল্পে ঐতিহাসিক সাফল্য, টিবিএম ‘দুর্গা’-র ব্রেকথ্রু অনুষ্ঠান ঘিরে উৎসাহ

আশ্বাস প্রশাসনের

সরকারের এই সিদ্ধান্তকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহল স্বাগত জানালেও কিছুটা সতর্কতার সুর শোনা গিয়েছে পরিবেশবিদদের কণ্ঠে। হিমালয়ান নেচার অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার ফাউন্ডেশনের সম্পাদক অনিমেষ বসুর বক্তব্য, পরিধি কমানো হলেও বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণ সুরক্ষায় যেন কোনও আপস না হয় এবং বন দপ্তর যেন এই বিষয়ে পুরোপুরি সতর্ক থাকে। পরিবেশবিদদের এই উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে বনমন্ত্রীও আশ্বাস দিয়েছেন, সমস্ত দিক খতিয়ে দেখেই চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি হবে।

দুর্নীতি নিয়ে কড়া বার্তা

বন দপ্তরের অন্দরে কোনও রকম দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবে না বলেও স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়েছে এই বৈঠকে। অতীতে দপ্তরে কোথায় কী দুর্নীতি হয়েছে, তা তদন্তের বিষয় হলেও, আগামী দিনে যাতে তেমন কিছু না ঘটে, তার জন্য একাধিক কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। দুর্নীতির সন্দেহ বা অভিযোগ এলেই আইনি ও বিভাগীয়ভাবে কঠোর তদন্তের কথাও জানিয়েছে দপ্তর, অর্থাৎ জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েই চলবে বন দপ্তর।

আগামী দিনে কী প্রভাব

অরণ্য সপ্তাহ উপলক্ষে বৃক্ষরোপণের সংখ্যাও এ বার বাড়িয়ে সাত কোটি করা হয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই সমন্বিত সিদ্ধান্তের ফলে উত্তরবঙ্গের বনাঞ্চল লাগোয়া এলাকার দীর্ঘদিনের আইনি জট কাটবে, রাস্তাঘাট-সহ অন্যান্য সরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্প গতি পাবে। পাশাপাশি ঝাড়গ্রামের নতুন সাফারি পার্ক বাস্তবায়িত হলে জঙ্গলমহলের পর্যটনেও জোয়ার আসতে পারে।যার জেরে চাঙ্গা হবে সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক চিত্র।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment