বীরভূমের (Birbhum) বহুচর্চিত পাথর ব্যবসায়ী টুলু মণ্ডলের (Tulu Mondal) বিপুল সম্পত্তি ও নগদ উদ্ধারের তদন্তে নতুন মোড়। শনিবার ধৃত মিনার মণ্ডলকে (Minar Mondal) সঙ্গে নিয়ে মহম্মদবাজারের সোঁতশালে টুলুর অফিসে তল্লাশি চালায় পুলিশ। গোটা এলাকা ঘিরে রেখে চলে অভিযান। অফিসের ভিতর থেকে সিন্দুক বা বাক্স ভাঙার আওয়াজ শোনা যায়, যা ঘিরে আরও নগদ টাকা, সোনা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধারের জল্পনা তুঙ্গে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সোঁতশালের এই অফিস থেকেই টুলু মণ্ডলের পাথর ব্যবসার বড় অংশ পরিচালিত হত। খাদান থেকে আসা অর্থ প্রথমে এই অফিসে জমা পড়ত বলে তদন্তকারীদের অনুমান। এখান থেকেই বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনের নথিপত্র তৈরি ও সংরক্ষণ করা হত বলেও পুলিশের হাতে তথ্য এসেছে।
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, অফিসে চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট-সহ একাধিক কর্মী নিয়মিত কাজ করতেন। ওই ঠিকানাই ব্যবহার করা হত বিভিন্ন আর্থিক নথি ও লেনদেনের ক্ষেত্রে। ধৃত মিনার মণ্ডলকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় এই অফিস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতেই শনিবার সেখানে তল্লাশির সিদ্ধান্ত নেয় তদন্তকারী দল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, অফিসের ভিতরে একাধিক কম্পিউটার, প্রিন্টার এবং গুরুত্বপূর্ণ নথি সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। সেই সব ডিজিটাল ডিভাইস ও কাগজপত্র থেকে আর্থিক লেনদেনের আরও তথ্য মিলতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা অফিস খুলেই শুরু হয়েছে তল্লাশি। কী কী উদ্ধার হয়েছে, তা নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি পুলিশ।
এই তদন্তের সূত্রপাত গত বুধবার। সেদিন ভোর থেকে মিনার মণ্ডলের বাড়িতে টানা ১৯ ঘণ্টার অভিযানে উদ্ধার হয় ২৮ কোটি টাকা নগদ এবং ১৫ কেজি সোনা। পরদিন সকালে মিনার ও তাঁর ছেলেকে গ্রেফতার করা হয়। জেরায় ধৃতদের কাছ থেকে এমন তথ্য মিলেছে, যার ভিত্তিতেই তদন্ত আরও গভীরে পৌঁছেছে বলে দাবি পুলিশের।
তদন্তকারীদের দাবি, ধৃতরা জেরায় স্বীকার করেছে উদ্ধার হওয়া বিপুল নগদ অর্থ টুলু মণ্ডল এবং তাঁর সিন্ডিকেটের। পুলিশের অনুমান, দীর্ঘদিন ধরে এই চক্রে নগদ অর্থ ও সোনার মাধ্যমে লেনদেন চলত। উদ্ধার হওয়া সম্পত্তির উৎসও সেই অবৈধ আর্থিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে বলে সন্দেহ।
স্থানীয়দের কাছে ‘পাথরসম্রাট’ নামে পরিচিত টুলু মণ্ডলের বিরুদ্ধে চলা অভিযানে এখনও পর্যন্ত ১৫০ কোটিরও বেশি নগদ অর্থ, সোনা এবং সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রের দাবি। যদিও এই গোটা চক্রের মূল অভিযুক্ত টুলু মণ্ডল এখনও অধরা। তাঁকে খুঁজে বের করার পাশাপাশি গোটা আর্থিক নেটওয়ার্কের শিকড়ে পৌঁছতেই একের পর এক সহযোগী ও ঘনিষ্ঠদের বাড়ি এবং অফিসে অভিযান চালানো হচ্ছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে শুক্রবার নবান্নে (Nabanna) সাংবাদিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari) রাজ্যের পাথর শিল্পে দীর্ঘদিনের দুর্নীতির অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, গত ১৫ বছরে শুধুমাত্র বীরভূমের পাথর খাত থেকেই প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) এই ক্ষতির জন্য দায়ী বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী আরও দাবি করেন, সরকারি খাতায় বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা জমা পড়লেও বাস্তবে প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা বেআইনি পথে বেরিয়ে যেত। তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে সেই আর্থিক নেটওয়ার্কের আরও নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে বলেই মনে করছে তদন্তকারী মহল। এখন নজর, সোঁতশালের অফিস থেকে উদ্ধার হওয়া নথি বা সামগ্রী তদন্তে কতটা নতুন দিশা দেখায় এবং অধরা টুলু মণ্ডলের খোঁজে কতটা সহায়ক হয়।
Leave a Comment