---Advertisement---

কোনো মানচিত্র নয়, মানুষের ভালোবাসাই আমার দেশ – তসলিমা

By Suman Debnath

August 1, 2026 8:56 PM

কোনো মানচিত্র নয়, মানুষের ভালোবাসাই আমার দেশ – তসলিমা

---Advertisement---


শনিবার রবীন্দ্রসদনের মঞ্চে আলো নিভতেই ভেসে উঠল একটি শব্দ— ‘ফেরা’। তারপরই হাততালির মধ্যে মঞ্চে এলেন তসলিমা নাসরিন। দীর্ঘ উনিশ বছর পর কলকাতার জনসমক্ষে তাঁর এই প্রত্যাবর্তন শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল না, বরং নির্বাসন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং বাংলা ভাষার সঙ্গে এক লেখিকার সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ও যেন।
শনিবার সন্ধ্যায় সেকুলার মিশন ট্রাস্ট ও ‘পশ্চিমবঙ্গের জন্য’-এর উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নির্ধারিত সময়ের কিছু পরে মঞ্চে ওঠেন তসলিমা। তাঁকে স্বাগত জানাতে হাততালিতে মুখর হয়ে ওঠে রবীন্দ্রসদন। অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা ওসমান মল্লিক জানান, শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, দেশের নানা প্রান্ত, এমনকি ইউরোপ ও আমেরিকা থেকেও অনেকেই এসেছেন তসলিমাকে একঝলক দেখতে।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তাঁকে স্বাগত জানান। মূখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ আপনার যখন মনে হয় তখন আসবেন, আপনার সুরক্ষার দায়িত্ব আমার।
মঞ্চে ছিলেন স্বপন দাশগুপ্ত, কল্যাণ চক্রবর্তী, অগ্নিমিত্রা পাল, তথাগত রায়, মানবাধিকার কর্মী মোহিত রায়, সমাজকর্মী শাশ্বতী ঘোষ, কবি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি। উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী কল্যাণ চক্রবর্তী ও অগ্নিমিত্রা পাল।
তবে আবেগঘন সন্ধ্যায় বিতর্কও এড়ানো গেল না। বক্তব্য শুরু করার আগে তসলিমা কবি জয় গোস্বামীকে কয়েকটি কথা বলার অনুরোধ জানান। সেই সময় দর্শকদের একাংশ ‘চটি চাটা’ বলে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে উঠতেই জয় গোস্বামী মঞ্চ ছেড়ে নিজের আসনে ফিরে যান।

আরও পড়ুন:  ‘সাংবাদিকদের উপর হামলাকারীরা ছাত্র নয়, জামাতি-মৌলবাদী’, কড়া বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর

এরপর প্রায় এক ঘণ্টার বক্তব্যে তসলিমা ফিরে যান নিজের নির্বাসনের অভিজ্ঞতা, কলকাতা ছাড়ার স্মৃতি এবং ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে। তিনি বলেন, ‘ধর্মনিরপেক্ষতা মানে সব ধর্মের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া নয়। ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকবে না। রাষ্ট্রের পরিচয় হবে ন্যায়, সমতা এবং আইনের শাসন।’

ধর্মীয় মৌলবাদের প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য ছিল আরও স্পষ্ট। ‘যে মতাদর্শ যার নাম, তাকে তার নামেই ডাকি। ইসলামিক মৌলবাদকে ইসলামিক মৌলবাদই বলি। হিন্দুত্ববাদী মৌলবাদকে হিন্দুত্ববাদী মৌলবাদই বলি। কোনো মতাদর্শকে অন্য নামে আড়াল করার প্রয়োজন দেখি না।’ তাঁর দাবি, মৌলবাদের বিরোধিতা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়; বরং সব ধরনের অসহিষ্ণুতা, নারী-বিদ্বেষ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আক্রমণের বিরুদ্ধে অবস্থান।
তিনি বলেন , ‘ যাঁরা আমাকে প্রশ্ন করেন তাঁরা রাজা রামমোহন রায় এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকেও প্রশ্ন করেন তাঁরা কেন এক ধর্মের কু-সংস্কারের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন?
আমি ইসলামিক মৌলবাদের বিরুদ্ধে বলতে পারি কারণ তা আমি ছোটবেলা থেকে খুব কাছ থেকে দেখেছি।

আরও পড়ুন:  আন্দোলন শেষ, মমতাকে ফোন করে ধন্যবাদ অভিজিৎ দীপকের! দিল্লি সফর আপাতত স্থগিত তৃণমূল নেত্রীর

বক্তব্যের শেষেও ছিল আবেগের সুর। কলকাতার উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘কলকাতা, এত বছর তোমায় প্রশ্ন করেছি— আমি কী ক্ষতি করেছিলাম তোমার? উত্তরের দাবি করি না, শুধু জানতে চাই। অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, চিরস্থায়ী নয়।’
তারপর কিছুক্ষণ থেমে যোগ করেন, ‘আমার মতো পরিণতি যেন আর কারও না হয়। শেষ পর্যন্ত আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি— কোনো মানচিত্র নয়, মানুষের ভালোবাসাই আমার দেশ।’
রবীন্দ্রসদনের সেই সন্ধ্যায় তাই ‘ফেরা’ কেবল একজন নির্বাসিত লেখিকার মঞ্চে প্রত্যাবর্তন নয়; ছিল স্মৃতি, বিতর্ক, রাজনৈতিক অভিঘাত এবং এক শহরের সঙ্গে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর পুনর্মিলনেরও গল্প।

---Advertisement---

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment