মাটির সঙ্কটে ধুঁকছে কুমোরটুলি, দুর্গা প্রতিমার মাটি জুটলেও কালীপুজোয় কী হবে, চিন্তায় মৃৎ শিল্পীরা

By Suman Debnath

September 29, 2026 3:10 PM

মাটির সঙ্কটে ধুঁকছে কুমোরটুলি, দুর্গা প্রতিমার মাটি জুটলেও কালীপুজোয় কী হবে, চিন্তায় মৃৎ শিল্পীরা


মাটির চিন্তায় মাথায় হাত কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের। দুর্গাপুজোর প্রতিমা তৈরির জন্য এ বছর কোনও রকমে মাটির ব্যবস্থা হলেও কালীপুজোর মাটি কোথা থেকে আসবে, তা এখনও স্পষ্ট নয় কুমোরটুলির মৃৎশিল্পীদের কাছে।

পঁচিশ বছর আগে উলুবেড়িয়া থেকে নিয়মিত মাটি আসত। কিন্তু বিগত কুড়ি বছর ধরে ডায়মন্ড হারবার থেকেই মাটি আসে। এবছর যে মাটি পাওয়া গিয়েছে, তা স্টোর করে রাখা মাটি। এবছর আর নতুন মাটি কাটা হয়নি। এখন সেখানে মাটি কাটার অনুমতি না মেলায় নতুন উৎস খুঁজতে হচ্ছে শিল্পীদের। ফলে দুর্গাপুজোর পরেই ফের বড়সড় মাটি সঙ্কট দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা তাঁদের।

 

মাটি সংগ্রহের নিয়ম অনুযায়ী, প্রথমে জমির মালিকের সঙ্গে চুক্তি করতে হয়। আগে ‘কুমারটুলি মৃৎশিল্প সাংস্কৃতিক সমিতি’ উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করে জমির মালিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। জমিটি শালী জমি কি না, তার নথিও যাচাই করা হয়। এরপর জমির কাগজপত্র ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের কাছে জমা দিয়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ মাটি কাটার অনুমতি নিতে হয়।

 

শিল্পীদের দাবি, ভূমি দপ্তরের অনুমতির পর সেই সংক্রান্ত তথ্য জেলা প্রশাসনকে জানাতে হয় মৃৎশিল্প সংগঠনকে। জেলা শাসক বা অতিরিক্ত জেলা শাসকের অনুমতির পর বিষয়টি জেলা পুলিশ এবং কলকাতা পুলিশকেও জানাতে হয়। মাটি পরিবহনের জন্য যাবতীয় তথ্যও দিতে হয়। ফলে মাটি সংগ্রহ ও পরিবহনের পুরো প্রক্রিয়াটিই হয়ে ওঠে দীর্ঘ এবং সময়সাপেক্ষ।

আরও পড়ুন:  হাওড়া মেট্রো স্টেশনে মিলল প্রায় ১৪ লক্ষ টাকার রুপোর বার

বর্তমানে প্রতিমা গড়ার জন্য ডায়মন্ড হারবারের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন শিল্পীরা। কিন্তু সেখানেও মাটি কাটার অনুমতি মিলছে না বলে তাঁদের দাবি। তবে চলতি দুর্গাপুজোয় যে মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে, তার একটি বড় অংশ গত বছর সংগ্রহ করে রাখা হয়েছিল। শিল্পীদের বক্তব্য, সেই সীমিত পরিমাণ সঞ্চিত মাটিই ব্যবহার করা হচ্ছে দুর্গা প্রতিমা তৈরিতে।

 

মৃৎশিল্পীদের আশঙ্কা, দুর্গাপুজোর চাহিদা কোনও ভাবে সামাল দেওয়া গেলেও কালীপুজো, জগদ্ধাত্রীপুজো এবং সারা বছর ধরে বিভিন্ন প্রতিমার জন্য মাটির জোগান নিয়ে সমস্যা থেকেই যাচ্ছে। তাঁদের মতে, শুধু কলকাতার কুমোরটুলিই নয়, রাজ্যের বিভিন্ন জেলার মৃৎশিল্পীরাও একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। ফলে এটি কোনও একটি নির্দিষ্ট এলাকার সমস্যা নয়, প্রতিমা শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বৃহৎ কর্মক্ষেত্রের সমস্যা।

মৃৎশিল্পী সুদীপ পাল বলেন, ‘উত্তরপ্রদেশে প্রতিমা তৈরির জন্য শিল্পীদের বিনামূল্যে মাটি দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাতেও একই ধরনের ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, সরকার দায়িত্ব নিয়ে বৈধ পথে মাটি সরবরাহের ব্যবস্থা করলে এক দিকে শিল্পীদের সমস্যা কমবে। অন্যদিকে মাটি নিয়ে কালোবাজারির আশঙ্কাও কমবে।’

আরও পড়ুন:  ২০ শতাংশ বাড়ছে পুজোর বোনাস, উত্তরবঙ্গের চা-শ্রমিকদের জন্য খুশির খবর নবান্নের

অন্যদিকে, মাটির পাশাপাশি প্রতিমা তৈরির অন্যান্য কাঁচামালের দামও বেড়েছে বলে শিল্পীদের অভিযোগ। কুমারটুলি মৃৎশিল্প সাংস্কৃতিক সমিতির যুগ্ম সম্পাদক রঞ্জিত সরকার জানিয়েছেন, শাল কাঠের পরিবর্তে এখন তেঁতুল কাঠ দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরি করতে হচ্ছে। কাঠামোর জন্য প্রয়োজনীয় বাঁশ সংগ্রহের ক্ষেত্রেও আগের মতো সুবিধা নেই। সুন্দরবন থেকে গঙ্গায় যে বাঁশ ভাসিয়ে নিয়ে আসা হতো, তা আগে বিভিন্ন ঘাট থেকে সংগ্রহ করা যেত। এখন শুধু কুমোরটুলি ও বরানগর ঘাট থেকে সংগ্রহ করার অনুমতি রয়েছে। ফলে সেখানেও পরিবহন ও সংগ্রহের খরচ বেড়েছে।

ফলে মাটির জোগান, কাঠ, বাঁশ এবং অন্যান্য কাঁচামালের মূল্য— সব মিলিয়ে প্রতিমা তৈরির খরচের উপর চাপ বাড়ছে। দুর্গাপুজোর মরশুমে আপাতত কাজ এগোলেও কালীপুজো ও পরবর্তী মরশুমের জন্য স্থায়ী মাটির উৎস নিশ্চিত না হলে সঙ্কট আরও বাড়তে পারে বলেই আশঙ্কা মৃৎশিল্পীদের।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment