প্রায় ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরে কোনও রাখঢাক না রেখেই একের পর এক স্পর্শকাতর বিষয়ে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। রবীন্দ্রসদনে অনুষ্ঠান এবং পরদিন সাংবাদিক বৈঠকে তিনি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, সমান শিক্ষাব্যবস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, মুক্তচিন্তার সংকট-সহ একাধিক বিষয়ে মন্তব্য করেন। একইসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে আসার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদও জানান তিনি।
সাংবাদিক বৈঠকের শুরুতেই রবীন্দ্রসদনের অনুষ্ঠানে কবি জয় গোস্বামীকে মঞ্চে উঠতে না দেওয়ার ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেন তসলিমা। তাঁর কথায়, “জয় গোস্বামীর অপমান শুধু তাঁর অপমান নয়, সেটি আমারও অপমান।” একজন কবিকে এভাবে অসম্মান করা প্রগতিশীল সমাজের পক্ষেও অসম্মানের বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এরপর বাংলাদেশে গ্রেপ্তার ইস্কনের সন্ন্যাসী চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের প্রসঙ্গ তোলেন তসলিমা। তিনি বলেন, চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের মুক্তির দাবিতে বহু মানুষ প্রতিবাদ করছেন। তবে শুধুমাত্র প্রতিবাদে সবসময় ফল মেলে না বলেও আক্ষেপ প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
এরপরই শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নিজের সবচেয়ে কড়া অবস্থান স্পষ্ট করেন তসলিমা। তাঁর বক্তব্য, দেশে ধর্মভিত্তিক আলাদা শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজন নেই। সব শিশুর জন্য একই ধরনের আধুনিক, বিজ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক শিক্ষা থাকা উচিত। তিনি বলেন, মাদ্রাসা ব্যবস্থা তুলে দিয়ে অভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা চালু হওয়া প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগ, অনেক মাদ্রাসায় অমুসলিমদের প্রতি ঘৃণার মনোভাব তৈরি করা হয় এবং এই শিক্ষা সমাজকে বিভক্ত করে। তাঁর মতে, ধর্মীয় শিক্ষার বদলে এমন শিক্ষা প্রয়োজন, যা কর্মসংস্থান ও আধুনিক সমাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পাশাপাশি তিনি বলেন, সমাজে আরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানো নয়।
নিজের অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ টেনে তসলিমা বলেন, ধর্মীয় মৌলবাদের সমালোচনা করার কারণেই অতীতে তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে রাস্তায় নেমেছিল মৌলবাদীরা। তবু মুক্তচিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে তিনি কোনও আপস করবেন না বলে স্পষ্ট জানান।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে লেখিকা দাবি করেন, হিন্দু-সহ সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার এখনও অব্যাহত রয়েছে এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তা আরও বেড়েছে। তাঁর মতে, ধর্ম নয়, নাগরিক পরিচয়ই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের ভিত্তি। সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের কোনও সম্পর্ক থাকা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বহু লেখক, বুদ্ধিজীবী ও মুক্তচিন্তক আজ নিরাপদে দেশে থাকতে পারছেন না। অনেকেই তাঁর মতো বিদেশে থাকতে বাধ্য হয়েছেন। একইসঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে জামায়াতে ইসলামী প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকলে গণতন্ত্রের জন্য তা ভালো হতো।
কলকাতায় স্থায়ীভাবে থাকবেন কি না, সে বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নেননি বলে জানান তসলিমা। তবে তিনি বলেন, যে কোনও সরকার যদি তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তাহলে তিনি আবারও এই শহরে আসবেন। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে তাঁকে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল, তৃণমূল সরকারের সময়ে তাঁকে আর ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বর্তমান বিজেপি সরকার তাঁকে নিরাপত্তা দিয়ে কলকাতায় আসার সুযোগ করে দেওয়ায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ধন্যবাদ জানান।
শেষে দুই বাংলার মানুষের উদ্দেশে শান্তি ও সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে তসলিমা বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল মানবতা, স্বাধীনতা ও সাম্যের। সেই চেতনাকেই এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। ধর্ম নয়, মানুষের অধিকার ও মুক্তচিন্তার ভিত্তিতেই সমাজ গড়ে উঠুক— এই বার্তাই দেন নির্বাসিত লেখিকা।
Leave a Comment