প্রায় দুই দশকের অপেক্ষার অবসান। ২০০৭ সালে বিতর্কের জেরে কলকাতা ছাড়তে বাধ্য হওয়ার পর অবশেষে আবারও রবীন্দ্র সদনের মঞ্চে ফিরলেন তসলিমা নাসরিন (Taslima Nasrin)। দীর্ঘ নির্বাসনের যন্ত্রণা, কলকাতার প্রতি অটুট টান এবং অতীতের ক্ষোভ— সবই উঠে এল তাঁর আবেগঘন বক্তব্যে। একইসঙ্গে তিনি বাম সরকারের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “ইতিহাস মনে রাখে, কারা দরজা বন্ধ করেছিল, কারা খুলল।” বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)-কে ধন্যবাদ জানালেও স্পষ্ট করে দেন, এই কৃতজ্ঞতা কোনও রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রকাশ নয়।
কলকাতায় ফিরে আবেগ সামলাতে পারেননি লেখিকা। রবীন্দ্র সদনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন, শহরটি কখনও তাঁর মন থেকে দূরে সরে যায়নি। বারবার নিজেকে প্রশ্ন করেছেন, “আমি কলকাতার কী ক্ষতি করেছিলাম? কেন আমাকে চলে যেতে হয়েছিল?” তবে এ দিন তিনি জানান, উত্তর খুঁজতে নয়, বরং ফিরে আসার আনন্দ ভাগ করে নিতেই তিনি এসেছেন।
তসলিমার কথায়, “আজ আমি ফিরে এসেছি। আমার চোখে জল আছে, মনে অভিমান আছে, কিন্তু দু’হাত ভরা ভালোবাসাও আছে। যে শহর আমাকে কাঁদিয়েছে, সেই শহরই আমাকে স্বপ্ন দেখিয়েছে। যে শহর ছেড়ে যেতে হয়েছিল, সেই শহরে ফেরার স্বপ্ন আমি গত ১৯ বছর ধরে দেখেছি।” তিনি আরও বলেন, এই দীর্ঘ সময় কেউ আর ফিরিয়ে দিতে পারবে না, কিন্তু আজকের এই প্রত্যাবর্তন অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রতীক।
এরপরই তিনি বাম আমলের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “অন্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে, কিন্তু চিরস্থায়ী নয়। ইতিহাস মনে রাখে, কারা দরজা বন্ধ করেছিল, আর কারা সেই দরজা খুলে দিয়েছে।” এই মন্তব্যকে রাজনৈতিক মহলে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে, কারণ ২০০৭ সালে বামফ্রন্ট সরকারের আমলেই তাঁকে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল।
সেই সময় তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘দ্বিখণ্ডিত’ প্রকাশকে কেন্দ্র করে রাজ্যে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়। কট্টরপন্থী সংগঠনগুলির প্রতিবাদে কলকাতার একাধিক এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হয়। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য (Buddhadeb Bhattacharjee)-র নেতৃত্বাধীন সরকার বইটির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং পরে তসলিমাকে কলকাতা ছাড়তে বলা হয়। সাহিত্য ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে সেই সিদ্ধান্ত আজও বিতর্কিত।
নিজের বক্তব্যে তসলিমা সরাসরি কোনও রাজনৈতিক প্রচার না করলেও বর্তমান সরকারের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেন। তিনি জানান, তাঁকে আবার কলকাতায় ফিরে আসার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। তবে সেই কৃতজ্ঞতার সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক অবস্থানকে মেলানো উচিত নয় বলেও স্পষ্ট করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী লেখিকাকে আশ্বস্ত করে বলেন, “আপনি যতবার ইচ্ছা কলকাতায় আসবেন। আপনার নিরাপত্তার দায়িত্ব মুখ্যমন্ত্রীর।” এই ঘোষণার পর তসলিমার মুখে হাসি ফুটতে দেখা যায়। দীর্ঘ ১৯ বছরের অপেক্ষার পর প্রিয় শহরে ফেরার অনুমতি তাঁর কাছে শুধু একটি সফর নয়, বরং ব্যক্তিগত লড়াইয়ের এক বড় স্বীকৃতি হিসেবেই ধরা দিল।
কলকাতায় তসলিমা নাসরিনের এই প্রত্যাবর্তন শুধু একজন লেখিকার শহরে ফেরা নয়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাহিত্য এবং রাজনৈতিক ইতিহাস— এই তিনটি বিষয়কে ঘিরে নতুন করে আলোচনারও সূত্রপাত করল।
Leave a Comment