প্রাথমিকে এক ক্লাস, এক শিক্ষক! পড়ুয়াদের উন্নতির ভিত্তিতে ইনক্রিমেন্ট, প্রস্তাব ঘিরে বিতর্ক

By Suman Debnath

October 29, 2026 8:00 PM

প্রাথমিকে এক ক্লাস, এক শিক্ষক! পড়ুয়াদের উন্নতির ভিত্তিতে ইনক্রিমেন্ট, প্রস্তাব ঘিরে বিতর্ক


প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বড়সড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা ঘিরে শুরু হয়েছে আলোচনা। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় একটি শিক্ষাবর্ষে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির দায়িত্বে থাকবেন একজন শিক্ষক। ওই শ্রেণির পড়ুয়াদের বিভিন্ন বিষয় পড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের সামগ্রিক অগ্রগতির দিকেও নজর রাখবেন তিনি। শুধু পাঠদানের পদ্ধতিতে পরিবর্তন নয়, পড়ুয়াদের উন্নতির নিরিখে শিক্ষকদের মূল্যায়ন এবং ইনক্রিমেন্ট নির্ধারণের বিষয়টিও আলোচনায় উঠে এসেছে। তবে এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে তার বাস্তব প্রয়োগ কী ভাবে হবে, তা নিয়ে শিক্ষামহলে মতভেদ রয়েছে।
রাজ্য সরকারের স্কুলশিক্ষা দফতরের মন্ত্রী দীপক বর্মনের বক্তব্য অনুযায়ী, শিক্ষকদের দায়িত্ব নির্দিষ্ট করে দিলে কাজের প্রতি নিষ্ঠা ও দায়বদ্ধতা বাড়তে পারে। তাঁর কথায়, “আমরা চর্চা করে, আলোচনা করে, যে বিষয়গুলো দেখা গিয়েছে, যদি আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব ফিক্সড হয়ে যায়, তা হলে সেই কাজের ওপর নিষ্ঠাও বেড়ে যায়।”

এই ব্যবস্থার সমর্থকদের যুক্তি, একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির পড়ুয়াদের সঙ্গে সারা বছর কাজ করলে শিক্ষক তাঁদের শেখার ধরন, দুর্বলতা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাবেন। সেই অনুযায়ী প্রত্যেক পড়ুয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া সম্ভব হতে পারে। প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার ভিত মজবুত করা এবং পড়ুয়াদের ব্যক্তিগত অগ্রগতির দিকে নজর দেওয়াই এই ভাবনার মূল উদ্দেশ্য।

আরও পড়ুন:  অবৈধ নির্মাণে আর রেহাই নয়! বিশাল জরিমানার হুঁশিয়ারি পুরমন্ত্রীর, ৩১ মার্চ পর্যন্ত তৈরি বাড়ি নিয়ে তদন্তের ঘোষণা

শিক্ষাবিদ কাজী মাসুম আখতার এই উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, প্রাথমিক শিক্ষাই শিক্ষাজীবনের ভিত্তি। একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির দায়িত্বে একজন শিক্ষক থাকলে পড়ুয়াদের যত্ন নিয়ে গড়ে তোলার সুযোগ বাড়তে পারে।

তবে প্রস্তাবিত ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নন্দিনী মুখোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য, রাজ্যের বহু স্কুলেই পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। এমন পরিস্থিতিতে একজন শিক্ষককে একটি শ্রেণির সব বিষয় পড়ানোর দায়িত্ব দেওয়া হলে সমস্যা তৈরি হতে পারে।

তাঁর প্রশ্ন, ভাষা, অঙ্ক, বিজ্ঞান, ইতিহাস ও ভূগোলের মতো বিভিন্ন বিষয় পড়ানোর জন্য একজন শিক্ষকের পক্ষে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রস্তুতি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি না। বিশেষত, তৃতীয় শ্রেণি থেকে বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু ক্রমশ বিস্তৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে তাঁর মত।

আরও পড়ুন:  রাজ্যে বাড়ছে ডেঙ্গির দাপট, আগামী বছরেই আসছে টিকা, ঘোষণা আইসিএমআর-এর

ফলে প্রস্তাবিত ব্যবস্থার সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—এক দিকে পড়ুয়াদের সঙ্গে শিক্ষকের নিবিড় যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত নজরদারি বাড়ানো, অন্য দিকে শিক্ষকস্বল্পতা এবং বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের মান বজায় রাখা।

শিক্ষকদের ইনক্রিমেন্ট পড়ুয়াদের অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত করার ভাবনাও নতুন করে বিতর্ক তৈরি করতে পারে। কারণ, পড়ুয়াদের ফলাফলের উন্নতি শুধু শিক্ষকের উপর নির্ভর করে না; পারিবারিক পরিবেশ, স্কুলের পরিকাঠামো, নিয়মিত উপস্থিতি এবং শিক্ষাসামগ্রীর প্রাপ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রাথমিক শিক্ষায় পরিবর্তনের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তার সাফল্য নির্ভর করবে শিক্ষকসংখ্যা, প্রশিক্ষণ, মূল্যায়নের নিরপেক্ষ পদ্ধতি এবং প্রতিটি স্কুলের বাস্তব পরিস্থিতির উপর। ফলে নতুন ব্যবস্থা ঘোষণার পাশাপাশি তার বিস্তারিত নীতি, প্রয়োগবিধি ও মূল্যায়নের কাঠামো স্পষ্ট হওয়াও জরুরি।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment