রবীন্দ্র আলেখ্যে নারী চরিত্রেরা,পর্ব ৮: ‘ল্যাবরেটরি’ এক মনস্তত্ত্বের গবেষণাগার

By Suman Debnath

November 7, 2026 5:45 PM

রবীন্দ্র আলেখ্যে নারী চরিত্রেরা,পর্ব ৮: ‘ল্যাবরেটরি’ এক মনস্তত্ত্বের গবেষণাগার


রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শেষ পর্বের গল্প ‘ল্যাবরেটরি’ বাংলা সাহিত্যে নারীচরিত্র নির্মাণের ইতিহাসে এক বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ সংযোজন। ‘ল্যাবরেটরি’ ছোটগল্পের কেন্দ্রে রয়েছে সোহিনী নামের এক দৃঢ়চেতা, বুদ্ধিমতী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন নারী। স্বামী নন্দকিশোরের মৃত্যুর পর তাঁর জীবনের প্রধান সাধনা হয়ে ওঠে স্বামীর প্রতিষ্ঠিত গবেষণাগারটিকে রক্ষা করা। নন্দকিশোরের বিজ্ঞানসাধনা ও স্বপ্নের প্রতি সোহিনীর গভীর শ্রদ্ধা তাঁকে এই দায়িত্ব পালনে অবিচল রাখে। সেই ল্যাবরেটরির উপযুক্ত উত্তরাধিকারী খুঁজতে গিয়ে তাঁর পরিচয় হয় অধ্যাপক চৌধুরীর সঙ্গে।

তাঁকে ঘিরে সোহিনীর মনে জাগে এক নতুন আকর্ষণ, অথচ সেই আকর্ষণের মধ্যেও কাজ করে স্বামীর সাধনাকে বাঁচিয়ে রাখার অঙ্গীকার। অন্যদিকে, সোহিনীর মেয়ে নীলার উপস্থিতি গল্পে নিয়ে আসে যৌবনের চঞ্চলতা, আকর্ষণ ও সম্পর্কের জটিলতা। মা ও মেয়ের ভিন্ন জীবনবোধ, ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা এবং ল্যাবরেটরিকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় নানা টানাপোড়েন। সোহিনী প্রচলিত সামাজিক নীতিবোধের ছাঁচে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি| নিজের অভিজ্ঞতা, বিবেচনা ও আত্মবিশ্বাসে জীবনকে বিচার করেন। শেষ পর্যন্ত ল্যাবরেটরি তাঁর কাছে হয়ে ওঠে স্মৃতি, প্রেম, আত্মত্যাগ ও এক অসমাপ্ত সাধনার প্রতীক। বৈজ্ঞানিক গবেষণা সেখানে গৌণ|

এই গল্পের সোহিনী এমন এক নারী, যার ব্যক্তিত্বের মধ্যে প্রেম, কামনা, আত্মমর্যাদা, বুদ্ধিমত্তা এবং বৃহত্তর আদর্শের প্রতি গভীর নিষ্ঠা এক আশ্চর্য সমন্বয় লাভ করেছে। নিজের অতীত অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধের মধ্য দিয়েই সে স্বতন্ত্র পরিচয় নির্মাণ করেছে। সমাজের প্রচলিত নৈতিকতার পরিবর্তে তার কাছে মানুষের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় তার মনন, বিচারবোধ ও কর্মের দ্বারা। সোহিনীকে সৃষ্টি করার মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ যেন তাঁর দীর্ঘ জীবনের নারীভাবনা, প্রেম সম্পর্কে উপলব্ধি এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার দর্শনকে এক নতুন সাহিত্যিক পরিণতি দিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের নারীভাবনা বুঝতে গেলে তাঁর ব্যক্তিজীবনের কয়েকটি অধ্যায়ের দিকে আলোকপাত প্রয়োজন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সাংস্কৃতিক পরিবেশ, পরিবারের সৃজনশীল নারীদের উপস্থিতি, কাদম্বরী দেবীর সঙ্গে তাঁর সাহিত্যিক ও মানসিক সংযোগ এবং মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে দাম্পত্য তাঁর জীবনবোধকে নানা দিক থেকে সমৃদ্ধ করেছিল। কাদম্বরী দেবী রবীন্দ্রনাথের কৈশোর ও প্রথম যৌবনের সাহিত্যিক জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি ছিলেন।

আরও পড়ুন: রবীন্দ্র আলেখ্যে নারী চরিত্রেরা,পর্ব ৭: বিভার প্রেম এবং আত্মত্যাগ, ‘রবিবার’ গল্পে নারীসত্তার এক বিশেষ মনস্তাত্ত্বিক দিক উন্মোচন

তাঁর লেখা পড়া, মতামত দেওয়া এবং সাহিত্যচর্চায় উৎসাহ জোগানোর মধ্য দিয়ে কাদম্বরী রবীন্দ্রনাথের সৃজনশীল জীবনের একজন সংবেদনশীল সঙ্গী হয়ে উঠেছিলেন। ১৮৮৪ সালে তাঁর আকস্মিক আত্মহত্যা তরুণ রবীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে আঘাত করেছিল। কাদম্বরী দেবীর জীবনের সঙ্গে সোহিনীর সরাসরি কোনো সম্পর্ক স্থাপন করা সমীচীন হবে না| তবে দুই নারীর জীবনকে পাশাপাশি রেখে সাহিত্যের আতসকাচে বিচার করলে উনিশ শতকের অন্তঃপুরের সীমাবদ্ধতা এবং রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী সাহিত্যিক নারীচরিত্রের আত্মপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাবগত পার্থক্য উপলব্ধি করা যায়।

১৮৮৩ সালে মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিবাহ হয়। তাঁদের দাম্পত্যজীবন, সংসার ও সন্তানদের নিয়ে তাঁর জীবনে নানা অভিজ্ঞতা সঞ্চিত হয়েছিল। ১৯০২ সালে মৃণালিনী দেবীর অকালমৃত্যু এবং পরবর্তী সময়ে কন্যা রেণুকা, পিতা দেবেন্দ্রনাথ ও পুত্র শমীন্দ্রনাথের মৃত্যু তাঁকে গভীর শোক সন্তাপের সম্মুখীন করে। এই ব্যক্তিগত বেদনাগুলির মধ্যেও রবীন্দ্রনাথ সাহিত্য, শিক্ষা ও সমাজগঠনের কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। ব্যক্তিগত শোককে বৃহত্তর সৃষ্টিশীল কর্মের মধ্যে রূপান্তরিত করার এই জীবনদর্শনের সঙ্গে ‘ল্যাবরেটরি’র সোহিনীর মানসিক উত্তরণের একটি তাৎপর্যপূর্ণ সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়।

আরও পড়ুন:  মীরা ভট্টাচার্যের নিরাপত্তা ফেরাচ্ছেন শুভেন্দু

গল্পে নন্দকিশোরের একটি বক্তব্য বিশেষভাবে স্মরণীয়—‘পতিব্রতা স্ত্রী চাও যদি, আগে ব্রতের মিল করাও।‘ এই বাক্যের মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের গভীর মনস্তাত্ত্বিক উপলব্ধি প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর দৃষ্টিতে দাম্পত্যের প্রকৃত ভিত্তি পারস্পরিক মানসিক সামঞ্জস্য, বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা। বিবাহের সামাজিক স্বীকৃতি সম্পর্ককে কাঠামো দেয়, কিন্তু তার অন্তর্গত প্রাণশক্তি তৈরি হয় দু’টি মানুষের চিন্তা ও অনুভূতির মিলনে। সোহিনীর চরিত্রের মূল্যায়নে রবীন্দ্রনাথ একটি অসাধারণ উপমা ব্যবহার করেছেন—‘কষ্টিপাথর আছে ওর মনে, তার উপরে দাগ পড়ল একটা দামি ধাতুর।‘

কষ্টিপাথর যেমন ধাতুর বিশুদ্ধতা যাচাই করে, তেমনই সোহিনীর মনও মানুষের প্রকৃত মূল্য নির্ণয় করতে সক্ষম। নন্দকিশোরের মধ্যে সে এমন এক ব্যক্তিত্ব আবিষ্কার করেছিল, যার জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিজ্ঞানসাধনার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো যায়। তার ভালোবাসা তাই ব্যক্তিগত আকর্ষণের সীমা অতিক্রম করে একজন মানুষের সৃষ্টিশীল সত্তার প্রতি স্বীকৃতিতে পরিণত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের অন্যান্য সাহিত্যকর্মেও নারীস্বাধীনতার এই প্রশ্ন নানা রূপে ফিরে এসেছে।

‘চোখের বালি’র বিনোদিনী নিজের প্রেম, আকাঙ্ক্ষা ও আত্মমর্যাদার মধ্য দিয়ে বিধবা নারীর প্রচলিত সামাজিক পরিচয়কে নতুনভাবে বিচার করার সুযোগ তৈরি করেছে। ‘স্ত্রীর পত্র’-এর মৃণালের বিখ্যাত সংলাপ, ‘আমি বাঁচলুম’, একজন নারীর আত্মপ্রতিষ্ঠার সাহসী ঘোষণা। অন্যদিকে ‘ঘরে বাইরে’র বিমলা ঘর ও বাইরের জগতের টানাপোড়েনে নিজের পরিচয় খুঁজেছে। এই চরিত্রগুলির মধ্যে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা এবং সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে ক্রমশ গভীরতর প্রশ্ন তুলেছেন। সোহিনীর মধ্যে সেই নারীভাবনা আরও জটিল ও পরিণত রূপ লাভ করেছে।

নারীর যৌনতা সম্পর্কেও রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল গভীর মনস্তাত্ত্বিক। মানুষের কামনা, আকর্ষণ ও ব্যক্তিগত সম্পর্ককে তিনি মানবপ্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবৃত্তির অংশ হিসেবে দেখেছেন। সোহিনী নিজের শরীর ও আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে সচেতন। তার জীবনে প্রেম, স্বার্থ, আবেগ ও আকর্ষণ পাশাপাশি অবস্থান করে। নিজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তার নির্ভীক স্বীকারোক্তি এই মানসিকতার পরিচয় বহন করে, ‘আমি তো গোড়াতেই নাম জুড়িয়েছি, নীতি কথা বলতে আমার বায়ে না। আজন্ম পবিত্রতার নাম শুনেছি। তবু করতে করতে প্রায়…’ এই বক্তব্যে সোহিনীর আত্মস্বীকৃতি এবং প্রচলিত পবিত্রতার ধারণা সম্পর্কে তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হয়েছে। তার কাছে মানুষের নৈতিক পরিচয় নির্ধারিত হয় অন্তরের সত্য, বিচারবোধ ও কর্মের দ্বারা।

নন্দকিশোরের মৃত্যুর পর সোহিনীর জীবনে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ল্যাবরেটরি তার কাছে স্বামীর স্মৃতি, বিজ্ঞানসাধনা ও জীবনের বৃহত্তর আদর্শের সম্মিলিত প্রতীক। সে বলে, ‘এইখানেই এই ল্যাবরেটরিতেই হয়েছে আমার স্বামীর সাধনা। তাঁর এই বেদীর তলায় কোনও একজন যোগ্য লোককে বাতি জ্বালিয়ে রাখবার জন্য যদি বসিয়ে দিতে পারি, তা হলে যেখানে থাকুন তাঁর মন খুশি হবে।‘ এই বক্তব্যে সোহিনীর ভালোবাসার গভীরতা প্রকাশিত। নন্দকিশোরের স্মৃতি রক্ষার সর্বোত্তম উপায় হিসেবে সে তাঁর অসমাপ্ত বিজ্ঞানসাধনাকে বাঁচিয়ে রাখার সংকল্প গ্রহণ করেছে।

ল্যাবরেটরি তার কাছে একটি মন্দিরের মতো, যেখানে কর্মের নিষ্ঠা ও সৃষ্টির সাধনা পবিত্রতার নতুন অর্থ নির্মাণ করেছে। এই দায়িত্ব পালনে সোহিনী বাস্তববুদ্ধি ও অসাধারণ দৃঢ়তার পরিচয় দেয়। সম্পত্তির লোভে আত্মীয়স্বজন ও স্বার্থান্বেষী মানুষেরা যখন ল্যাবরেটরির ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, তখন সে নিজেই আইনকানুন বোঝার উদ্যোগ নেয়। গল্পকারের ভাষায়, ‘সোহিনী স্বয়ং সমস্ত আইনের পাঠ নিতে লাগল বুঝে।‘ এই বর্ণনা তাকে স্মৃতিবাহী প্রেমিকা থেকে একজন সক্রিয় সংগঠক ও প্রতিষ্ঠানের রক্ষকের মর্যাদায় উন্নীত করেছে।

আরও পড়ুন:  অভিষেকের আপ্তসহায়ক সুমিতের বিরুদ্ধে কতগুলি এফআইআর? ডিজির রিপোর্ট তলব

সোহিনী ও নীলার চরিত্রের তুলনাও গল্পটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। নীলা সৌন্দর্য ও আকর্ষণকে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির উপায় হিসেবে ব্যবহার করে। রেবতীকে প্রভাবিত করার একটি দৃশ্যে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘রাত-কাপড় পরা, পাতলা সিল্কের শেমিজ। ও চমকে চৌকি থেকে উঠে পড়তে যাচ্ছিল। নীলা এসে ওর কোলের উপর বসে গলা জড়িয়ে ধরল।‘ এই দৃশ্যের মধ্যে নীলার আকর্ষণ সৃষ্টির কৌশল এবং রেবতীর মানসিক দুর্বলতা প্রকাশিত হয়েছে। নীলার কাছে ল্যাবরেটরি অর্থ ও ভোগের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র, অথচ সোহিনীর কাছে সেটি নন্দকিশোরের সাধনার উত্তরাধিকার।

আরও পড়ুন: রবীন্দ্র আলেখ্যে নারী চরিত্রেরা,পর্ব ৬: রবীন্দ্রনাথের ‘মাল্যদান’ এবং টেস্টটিউব চিঠির গল্প

দু’জনের ব্যক্তিত্বের এই বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, স্বাধীনতার প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় তার ব্যবহারের উদ্দেশ্যে। শেষ পর্যন্ত সোহিনী উপলব্ধি করে, তার মেয়েই ল্যাবরেটরিকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করেছে। তার স্বীকারোক্তি, ‘এইবার আমার মেয়ে আমার ল্যাবরেটরিকে বাঁচিয়েছে। আমি লোক চিনতে পারিনি, কিন্তু আমার মেয়ে ঠিক বুঝেছিল যে ল্যাবরেটরিতে গোয়ালঘর বসিয়ে দিয়েছিলুম—গোবরের কুণ্ডে আর একটু হলেই ডুবত সমস্ত জিনিসটা।‘

এই বক্তব্যে সোহিনীর আত্মসমালোচনার ক্ষমতা এবং নিজের ভুল স্বীকার করার মানসিক দৃঢ়তা প্রকাশিত হয়েছে। গল্পের শেষ পর্যায়ে নন্দকিশোরের মৃত্যু সম্পর্কে সোহিনীর উপলব্ধি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, ‘তিনি যাবার পথে তাঁর চিতার আগুনে আমার আসক্তিতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন। জমা পাপ একে একে জলে যাচ্ছে। এই ল্যাবরেটরিতেই জ্বলছে সেই হোমের আগুন।‘ এখানে চিতার আগুন ব্যক্তিগত জীবনের অবসানের প্রতীক, আর ল্যাবরেটরির আগুন সৃষ্টিশীল জীবনের ধারাবাহিকতার প্রতীক। নন্দকিশোরের মৃত্যু সোহিনীকে তার জীবনের উদ্দেশ্য নতুনভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছে। ব্যক্তিগত প্রেম বৃহত্তর সাধনার মধ্যে রূপান্তরিত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ নিজেও বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। জগদীশচন্দ্র বসুর সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব, বিজ্ঞান সম্পর্কে আগ্রহ এবং ‘বিশ্বপরিচয়’ গ্রন্থে সাধারণ পাঠকের কাছে বিজ্ঞানের জটিল বিষয় সহজভাবে তুলে ধরার প্রচেষ্টা তাঁর এই মনোভাবের পরিচয় বহন করে। ফলে ‘ল্যাবরেটরি’র বিজ্ঞানসাধনা গল্পের পটভূমির পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের জ্ঞান, অনুসন্ধান ও মানবকল্যাণ সম্পর্কে বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গিরও প্রকাশ। সবশেষে বলা যায়, ‘ল্যাবরেটরি’ রবীন্দ্রনাথের নারীভাবনার এক পরিণত ও জটিল প্রকাশ।

কাদম্বরী দেবীর সাহিত্যিক সান্নিধ্য, মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে দাম্পত্যজীবন, বিনোদিনী ও মৃণালের মতো সাহিত্যিক চরিত্র এবং নারীশিক্ষা সম্পর্কে তাঁর উদ্যোগ—এই সমস্ত অভিজ্ঞতা ও চিন্তার আলোকে সোহিনীর চরিত্র বিশেষ তাৎপর্য লাভ করেছে। সোহিনী রক্তমাংসের পূর্ণাঙ্গ মানুষ। তার মধ্যে প্রবৃত্তি ও বিবেক, প্রেম ও আত্মমর্যাদা, ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা ও বৃহত্তর দায়িত্ব এক জটিল সমন্বয়ে অবস্থান করছে। নন্দকিশোরের মৃত্যুর পর তাঁর বিজ্ঞানসাধনার উত্তরাধিকার রক্ষার মধ্য দিয়ে সোহিনী নিজের জীবনেরও এক নতুন অর্থ আবিষ্কার করেছে। এই কারণেই ‘ল্যাবরেটরি’ শুধু একজন নারীর প্রেম ও সংগ্রামের পাশাপাশি নারীস্বাধীনতা এবং ভালোবাসার সৃষ্টিশীল রূপান্তরের এক অসামান্য সাহিত্যিক দলিল।

দেখুন:

 

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment