প্রেসিডেন্সি জেলের ১৪ নম্বর সেল থেকে মাঝেমধ্যেই মিলছিল কিছু যান্ত্রিক সংকেত। প্রথমে বিষয়টি বুঝতে না পারলেও পরে রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ সূত্র খুঁজে পায়, সেই সংকেত আসছে জেলের ১৪ নম্বর সেল থেকেই। তদন্তে নেমে গোয়েন্দাদের হাতে আসে মোবাইলের টাওয়ারের অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য। আর সেই সূত্র ধরেই শুরু হয় অচেনা সংকেতের উৎস খোঁজার কাজ।
প্রেসিডেন্সি জেলের আধিকারিকদের মোবাইলের টাওয়ারের অবস্থানের সঙ্গে একটি অপরিচিত নম্বরের অবস্থান মিলতেই সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়। এরপরই তৎপর হয়ে ওঠে রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। জেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে শুরু হয় তল্লাশি। ১৪ নম্বর সেলে কে থাকেন, তা জানতে চাওয়া হলে জেল কর্তৃপক্ষ জানায়, ওই সেলের আবাসিক যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আফতাব আনসারি।
এর পরেই আফতাব আনসারির সেলে শুরু হয় তল্লাশি। তল্লাশিতে উদ্ধার হয় তিনটি মোবাইল ফোন, দুটি রাউটার, দুটি কার্ড রিডার, একটি পেনড্রাইভ এবং একটি ইয়ারফোন। জেলের ভিতর থেকে এত বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম উদ্ধারের পরই সন্দেহ আরও দানা বাঁধে তদন্তকারীদের মধ্যে।
এর পরেই আফতাব আনসারির ব্যবহৃত মোবাইল ফোনগুলির মাধ্যমে কার কার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল, তা খতিয়ে দেখা শুরু হয়। গত ২৪ ঘণ্টায় কোন কোন নম্বরে ফোন করা হয়েছিল, সেই তালিকাও তৈরি করছেন তদন্তকারীরা। ইতিমধ্যেই হেস্টিংস থানায় অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর নতুন করে ঘটনার তদন্ত শুরু হয়েছে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, গত দু’মাসে কলকাতা ও রাজ্য পুলিশের তৎপরতায় একাধিক জঙ্গি সংগঠনের সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। তাদের সক্রিয়তার বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে। ধৃত জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের নিজেদের হেফাজতে নিয়ে দফায় দফায় জেরা করে রাজ্য পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী দল জানতে পেরেছে, কোন পথে এগোচ্ছিল তারা। নিছক জঙ্গি কার্যকলাপ নয়, সম্ভাব্য গোপন যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বাংলায় নাশকতার ছক—একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে বলে সূত্রের খবর।
এই পরিস্থিতিতে জেলবন্দি আফতাব আনসারির সেল থেকে এতগুলি বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে তদন্তকারীদের মধ্যে। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আফতাব আনসারি জেলের ভিতর থেকে কার কার সঙ্গে যোগাযোগ রাখত, কাদের কাছে তথ্য পাঠানো হত, কিংবা ওই বৈদ্যুতিন সরঞ্জামগুলি কী কাজে ব্যবহার করা হত—তা নিয়েই এখন মূলত তদন্ত এগোচ্ছে।
ঘটনার তদন্তে ইতিমধ্যেই পুলিশের সাইবার শাখার সাহায্য চাওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে উদ্ধার হওয়া মোবাইল ফোন, রাউটার, পেনড্রাইভ-সহ অন্যান্য বৈদ্যুতিন সরঞ্জামের ফরেন্সিক পরীক্ষা করানো হতে পারে। সেগুলিতে থাকা তথ্য, যোগাযোগের বিবরণ এবং অন্যান্য নথি খতিয়ে দেখে আরও সূত্র পাওয়ার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।
অন্যদিকে, তদন্তকারীদের হাতে নতুন তথ্য আসার পর অতীতে আফতাব আনসারির সঙ্গে যাঁদের যোগাযোগ ছিল, তাঁদের তালিকাও নতুন করে খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে। সেই যোগাযোগের সূত্র ধরেই জেলের ভিতর থেকে কোনও গোপন নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছিল কি না, কিংবা বাইরের কারও সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছিল কি না, এখন সেটাই তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
Leave a Comment