উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ঐতিহ্যের গর্ব, ত্রিপুরার মেলাঘর রথযাত্রা!

By Suman Debnath

June 29, 2026 11:28 AM

উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ঐতিহ্যের গর্ব, ত্রিপুরার মেলাঘর রথযাত্রা!

মেলাঘর: ত্রিপুরার সিপাহিজলা জেলার মেলাঘরে অনুষ্ঠিত রথযাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম বৃহৎ ঐতিহ্যবাহী জনসমাগমের মেলা। প্রতি বছর লাখো ভক্ত, দর্শনার্থী ও পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে গোটা মেলাঘর। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের পাশাপাশি এই উৎসব ত্রিপুরার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন।

মেলাঘরের রথের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর বিশাল আকৃতি। প্রায় ৫৮ ফুট উঁচু এবং নয় চাকার এই কাঠের রথ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম বৃহত্তম রথ হিসেবে পরিচিত। রথটি নির্মাণে বহু দক্ষ কারিগর দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন। ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে তৈরি এই রথ শুধু ধর্মীয় আবেগের প্রতীক নয়, বরং ত্রিপুরার প্রাচীন কারুশিল্পেরও এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

রথযাত্রার প্রস্তুতির সূচনা হয় স্নানযাত্রার মধ্য দিয়ে। এদিন প্রভু জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে দুধ ও ডাবের জল দিয়ে পবিত্র স্নান করানো হয়। এরপর বিশেষ পূজা-অর্চনার মাধ্যমে রথের চাকায় খিলি লাগিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে রথ প্রস্তুতির শুভ সূচনা করা হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই আচার-অনুষ্ঠানের প্রায় ১৫ দিন পর মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা।

আরও পড়ুন:  থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত ৮ বছরের সুপ্রিতার চিকিৎসায় সহায়তা করলো আরোগ্য হেলথকেয়ার ফাউন্ডেশন

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মেলাঘরের রথযাত্রার ঐতিহ্য বহু দশকের পুরোনো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই উৎসব শুধু ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি ত্রিপুরার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। একসময় আশপাশের গ্রামের মানুষই মূলত এই উৎসবে অংশ নিতেন। কিন্তু বর্তমানে ত্রিপুরার বিভিন্ন জেলা ছাড়াও প্রতিবেশী রাজ্য এবং বাংলাদেশ থেকেও অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থী এই ঐতিহাসিক রথযাত্রা উপভোগ করতে মেলাঘরে আসেন।

রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে মেলাঘরে বসে বিশাল মেলা। এখানে বিভিন্ন ধরনের দোকান, স্থানীয় হস্তশিল্প, খেলনা, পোশাক, মাটির সামগ্রী, ধর্মীয় উপকরণ এবং সুস্বাদু খাবারের স্টল দর্শনার্থীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। পাশাপাশি নাগরদোলা, শিশুদের বিনোদনের নানা আয়োজন এবং লোকজ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উৎসবের আমেজকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। ফলে রথযাত্রা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি পারিবারিক মিলনমেলা ও আনন্দ উৎসবেও রূপ নেয়।

আরও পড়ুন:  খোয়াইয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় ভয়াবহ অব্যবস্থা! প্রায় ৫৮ বছরেও সংস্কার হয়নি বনেদী স্কুলের মূল গেট!

এই ঐতিহ্যবাহী মেলা স্থানীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কয়েক দিনের এই উৎসবকে ঘিরে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হস্তশিল্পী, পরিবহন ব্যবসায়ী এবং স্থানীয় দোকানিদের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। পর্যটকদের আগমনে এলাকার হোটেল, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। ফলে ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি এটি স্থানীয় অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

ত্রিপুরার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম প্রতীক হিসেবে মেলাঘরের রথযাত্রা আজ দেশ-বিদেশে পরিচিতি লাভ করেছে। প্রতিবছর এই উৎসবকে ঘিরে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নিরাপত্তা, যান চলাচল এবং দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, যাতে নির্বিঘ্নে লাখো মানুষের সমাগম পরিচালনা করা যায়।

ঐতিহ্য, ভক্তি, সংস্কৃতি এবং সম্প্রীতির অনন্য মিলনমেলায় মেলাঘরের রথযাত্রা আজ শুধু ত্রিপুরার নয়, সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের এক গর্বের নাম। শতবর্ষের ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে এই উৎসব আগামী প্রজন্মের কাছেও ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে থাকবে।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment