তেলিয়ামুড়া, মৃন্ময় রায়, ১২ জানুয়ারী ২০২৬, সোমবার : সময়ের স্রোতে বহু কিছু বদলে গেছে। বদলে গেছে বাড়ির উঠোন, বদলে গেছে উৎসবের ভাষা।
এক সময় যে আলপনা ছিল গ্রাম বাংলার ঘরের স্বাভাবিক অলংকার, আজ তা প্রায় হারিয়ে যাওয়া এক সাংস্কৃতিক স্মৃতি। পৌষ সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তিকে ঘিরে বাংলার গৃহস্থ বাড়ির আঙিনা এক সময় সেজে উঠত চালের গুঁড়ো আর সাদা মাটির নকশায়। ধানের শীষ, লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ, পদ্ম, শঙ্খ-চক্র—এই সব রেখায় ফুটে উঠত কৃষিভিত্তিক জীবনের আশা, সমৃদ্ধি আর মঙ্গলকামনা। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার কংক্রিট ছোঁয়ায় সেই দৃশ্য আজ অনেকটাই অতীত। তবুও সব আলো নিভে যায়নি।
তেলিয়ামুড়া মহকুমার প্রত্যন্ত ব্রহ্মছড়া ও মহারানীপুর (কপালিটিলা) গ্রামে আজও কিছু নারী তাঁদের হাতে আগলে রেখেছেন এই প্রাচীন ঐতিহ্য। পৌষ সংক্রান্তির আগেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন ব্রহ্মছড়ার সবিতা সরকার, অঙ্কিতা চৌধুরী সহ কয়েকজন গৃহবধূ এবং মহারানীপুর এলাকার যুবতী রিমি মজুমদার। ঘরের উঠোনে তাঁদের তুলির বদলে চলে আঙুল, রঙের বদলে চালের গুঁড়ো—তবু আবেগ আর নিষ্ঠায় কোনও ঘাটতি নেই। রিমি মজুমদার বলেন,“মায়ের হাত ধরেই আলপনা আঁকা শিখেছি। এই রীতি আমাদের শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। যতদিন পারি, আঁকব। পৌষ সংক্রান্তি মানেই নতুন ধান, পিঠে-পায়েস আর উঠোনে আলপনা।”
এই আলপনা শুধু নকশা নয়—এ এক নিঃশব্দ ভাষা, যার মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলেছে বাংলার কৃষিসভ্যতা, ঋতুচক্রের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নারীর সৃজনশীল আত্মপ্রকাশ। আজ যখন শহরে আলপনা কেবল ছবির ফ্রেমে বা স্মৃতির পাতায় সীমাবদ্ধ, তখন ব্রহ্মছড়া ও মহারানীপুরের উঠোনে আঁকা এই নকশাগুলো হয়ে উঠেছে এক ধরনের সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। এ যেন বলে দেয়—পরিবর্তনের ভিড়েও শিকড় ভোলা হয়নি। সংক্রান্তির প্রাক্কালে এই দুই গ্রামের নারীদের হাতে আঁকা প্রতিটি আলপনা তাই শুধু উৎসবের সাজ নয়, বরং এক দৃঢ় বার্তা— “আমরা এখনও আছি, আমরা এখনও আঁকি, আমরা এখনও বাংলার মাটি আর সংস্কৃতিকে ভালোবাসি।”
এই ভালোবাসাতেই বেঁচে আছে বাংলার প্রাণ, বাংলার গর্ব।









Leave a Comment