ত্রিপুরা,যশপাল সিং, ৬ জানুয়ারি ২০২৬, মঙ্গলবার: স্বাধীনতার বহু আগেই খোয়াই জেলার প্রথম চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে যাত্রা শুরু করা মহারাজগঞ্জ বাজার এলাকার স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানটি আজ চরম অবহেলা ও অনিশ্চয়তার মুখে। সময়ের নানা বাঁকে রূপ বদলালেও বর্তমানে এই স্থানেই গড়ে ওঠা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা কেন্দ্র কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। জেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ইতিহাসে এটি আজ এক বেদনাদায়ক অধ্যায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, ছন ও বাঁশের ঘরে গড়ে ওঠা এই চিকিৎসা কেন্দ্রই একসময় ছিল তৎকালীন খোয়াই জেলার একমাত্র চিকিৎসা ভরসা। পরবর্তীতে এটি পাকা ভবনের রূপ নেয়। খোয়াই জেলা হাসপাতাল নির্মিত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে এই কেন্দ্র হাসপাতালের বহির্বিভাগ বা আউটডোর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাম আমলে শেষপর্যায়ে এটিকে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা কেন্দ্র হিসেবে পুনর্গঠন করা হয়।
এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে খোয়াই জেলার গৌরবময় ইতিহাস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্বাধীনতার পূর্বে এখানে প্রথম চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন বিশিষ্ট নাট্যকার প্রয়াত হীরেন্দ্র সিনহার পিতা, স্বর্গীয় কৈলেস্বর সিনহা। বিশেষভাবে কৈলাসহর থেকে তাঁকে খোয়াইয়ে আনা হয়েছিল। অথচ সময়ের ব্যবধানে সেই স্মরণীয় অধ্যায় আজ প্রায় বিস্মৃতির অতলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একসময় আয়ুর্বেদিক কেন্দ্রে কর্মরত চিকিৎসকেরা পর্যায়ক্রমে বদলি হয়ে যান। বর্তমানে ওই কেন্দ্রের দুইজন চিকিৎসক খোয়াই জেলা হাসপাতালে কর্মরত। পর্যাপ্ত চিকিৎসক, কর্মী ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বহুদিন ধরেই কেন্দ্রটি বন্ধ পড়ে রয়েছে। জনসাধারণের অর্থে নির্মিত ভবনটি এখন ঝোপঝাড়ে ঢাকা, চারপাশে জমে রয়েছে আবর্জনা। শুধুমাত্র একটি পুরনো সাইনবোর্ডই যেন এর অস্তিত্বের শেষ চিহ্ন। দিনের আলোতেও নীরব ও পরিত্যক্ত ভবনটি স্থানীয়দের কাছে এখন ‘ভূতের বাড়ি’ হিসেবেই পরিচিত।
অন্যদিকে বর্তমান সরকার ও খোয়াই পুর পরিষদ শহরের ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে আধুনিক খোয়াই গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিলেও মহারাজগঞ্জ বাজার এলাকার বাস্তব চিত্র ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। একসময় খোয়াইয়ের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই বাজার আজ তার পুরনো জৌলুস অনেকটাই হারিয়েছে।
এই এলাকাতেই অবস্থিত একটি প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ ‘হরি মন্দির’, যেখানে বহু মূল্যবান ও ঐতিহাসিক মূর্তি সংরক্ষিত রয়েছে। দুর্গাপূজা ও রথযাত্রার সময় সাময়িকভাবে জনসমাগম বাড়লেও বছরের অধিকাংশ সময় এলাকাটি প্রায় নিস্তব্ধ থাকে। অতীতে এখানে একটি সিনেমা হলও ছিল, যা পরে অন্যত্র স্থানান্তরিত হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সুভাষপার্ক বাজার নতুন বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে এবং মহারাজগঞ্জ বাজার ধীরে ধীরে গুরুত্ব হারাতে শুরু করে।
যদিও বর্তমানে খোয়াই থানা, তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তর, পোস্ট অফিস এবং তহশিল অফিস এখনও মহারাজগঞ্জ এলাকাতেই রয়েছে, তবুও খোয়াই জেলার প্রথম বাজার হিসেবে এর ঐতিহ্য আজ অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। একসময় সীমান্ত হাট প্রকল্পের আওতায় বাসস্ট্যান্ড স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হলেও বর্তমান ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে সেই পরিকল্পনার ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত।
খোয়াইয়ের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকা এই আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা কেন্দ্র এবং মহারাজগঞ্জ বাজার এলাকাকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রশাসনের সক্রিয় হস্তক্ষেপ এখন সময়ের অন্যতম দাবি বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
Leave a Comment