---Advertisement---

NEET প্রশ্নফাঁসের ধাক্কায় ভেঙেছে স্বপ্ন, হারিয়েছে সন্তান: চার পরিবারের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা

By Suman Debnath

August 9, 2026 1:40 PM

NEET প্রশ্নফাঁসের ধাক্কায় ভেঙেছে স্বপ্ন, হারিয়েছে সন্তান: চার পরিবারের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা

---Advertisement---


নজরবন্দি ব্যুরো: ভারতের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাব্যবস্থাকে ঘিরে ক্ষোভ যখন ‘ককরোচ’ আন্দোলনের হাত ধরে দেশজুড়ে ছড়িয়েছে, তখন সেই আন্দোলনের নেপথ্যে থাকা আরেকটি নির্মম বাস্তবতা সামনে এসেছে। প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা বাতিল, ফের পরীক্ষার অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিনের পড়াশোনার চাপের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে সন্তান হারানো চার পরিবারের কথা তুলে ধরেছে দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian)। তাঁদের প্রত্যেকের গল্প আলাদা, কিন্তু অভিযোগের কেন্দ্রে একই প্রশ্ন—পরীক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার দায় শেষ পর্যন্ত পড়ুয়াদের উপরই কেন পড়বে?

জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান (Dharmendra Pradhan) পদত্যাগ করেন। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল তাঁর পদত্যাগ। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (Cockroach Janta Party) নামে পরিচিত যুব আন্দোলনের নেতৃত্বে দিল্লি-সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ, অবস্থান এবং অন্যান্য কর্মসূচি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ২৫ জুলাই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা করা হয়।

কিন্তু মন্ত্রী বদলালেই যে পরিবারের ক্ষত মুছে যায় না, সেটাই সামনে এসেছে এই চারটি পরিবারের অভিজ্ঞতায়। তাঁদের কেউ সন্তানের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখেছেন, কেউ ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার, কেউ চেয়েছেন নিজের পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি বদলে দিতে। পরীক্ষার ফল, প্রশ্নফাঁস বা পরীক্ষার কাঠামোর পরিবর্তন তাঁদের সেই স্বপ্নের সঙ্গে গভীর সংঘাত তৈরি করেছিল বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।

অংশিকা পাণ্ডে, ২০, দিল্লি

অংশিকা পাণ্ডের বাবা ও মা

দিল্লির তরুণী অংশিকা পাণ্ডের স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়া। পরিবারের বড় সন্তান হিসেবে ভাই-বোনদের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার কথাও ভাবতেন তিনি। তাঁর বাবা ইন্দ্রধর পাণ্ডে পেশায় ক্যাবচালক। পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতির মধ্যেও অংশিকা পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করতেন এবং চিকিৎসক হওয়ার লক্ষ্যে প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

২০২৬ সালের NEET ছিল তাঁর তৃতীয় চেষ্টা। ৩ মে পরীক্ষা দেওয়ার পর তাঁর মনে হয়েছিল এ বার সাফল্য আসতে পারে। কিন্তু কয়েক দিন পর প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এবং ফের পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্তের খবর আসে। পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, এতদিনের প্রস্তুতির পর আবার নতুন করে পরীক্ষা দেওয়ার চিন্তা তাঁকে গভীর ভাবে আঘাত করেছিল। এর দু’দিন পর তাঁর মৃত্যু হয়।

NEET প্রশ্নফাঁসের ধাক্কায় ভেঙেছে স্বপ্ন, হারিয়েছে সন্তান: চার পরিবারের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
অংশিকা পাণ্ডের আঁকা ছবি

বাড়িতে এখনও পড়ে রয়েছে তাঁর পড়ার বই, আঁকা ছবি এবং নিজের মনোবল বাড়ানোর জন্য লেখা নানা বার্তা। পরিবারের কাছে সেগুলিই এখন তাঁর স্মৃতি। বোন প্রগতি জানিয়েছেন, দিদির স্বপ্ন ছিল পরিবারকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা।

সুফি শাহিন, ১৯, দিল্লি

NEET প্রশ্নফাঁসের ধাক্কায় ভেঙেছে স্বপ্ন, হারিয়েছে সন্তান: চার পরিবারের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
Shaheen’s mother, Sultana Khatoon, looks at her school photos and report cards

সুফি শাহিনের লক্ষ্য ছিল সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হওয়া। পড়াশোনার পাশাপাশি ছবি আঁকা, পেইন্টিং এবং বিদেশি ভাষা শেখার প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। পরিবারের দাবি, অত্যন্ত মেধাবী এবং আত্মপ্রত্যয়ী এই তরুণী দীর্ঘদিন ধরে JEE পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

আরও পড়ুন:  ঈশ্বর রূপে পূজিত হবেন নরেন্দ্র মোদি, মন্দির তৈরীতে ছাড়পত্র মিলল বিহারে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে তাঁর মৃত্যু হয়। তার আগে JEE-র দ্বিতীয়বারের প্রস্তুতি এবং পরীক্ষার সিলেবাসে পরিবর্তন নিয়ে তিনি প্রবল চাপে ছিলেন বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। তাঁর মা সুলতানা খাতুন এখনও মেয়েকে হারানোর সেই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেননি।

NEET প্রশ্নফাঁসের ধাক্কায় ভেঙেছে স্বপ্ন, হারিয়েছে সন্তান: চার পরিবারের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
A sketch made by Sufi Shaheen

সুফির ভাই মাসুম পরবর্তীতে CUET-এ সারা দেশে ১৮৮তম স্থান অর্জন করেন। কিন্তু সেই সাফল্যের মুহূর্তে পরিবারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ—যে দিদি ভাইয়ের সাফল্য দেখতে চেয়েছিলেন, তিনি আর পাশে নেই।

প্রদীপ কুমার মাহিচ, ২২, রাজস্থান

NEET প্রশ্নফাঁসের ধাক্কায় ভেঙেছে স্বপ্ন, হারিয়েছে সন্তান: চার পরিবারের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
Pradeep Kumar Mahich celebrating his birthday with his sister, Babita

রাজস্থানের সিকার জেলার কৃষক পরিবারের ছেলে প্রদীপ কুমার মাহিচের চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন ছিল। ২০২৬ সালের NEET ছিল তাঁর চতুর্থ চেষ্টা। ৩ মে পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে বাবা রাজেশ কুমারকে জানিয়েছিলেন, এ বার তিনি আত্মবিশ্বাসী।

পরিবারের জন্য এই প্রস্তুতির আর্থিক চাপও ছিল বিশাল। ছেলের পড়াশোনার খরচ চালাতে রাজেশ কুমার জমির একটি বড় অংশ বিক্রি করেছিলেন এবং প্রায় ১১ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। সিকারের কোচিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে বছরের পর বছর ধরে পরিবারকে পড়াশোনার খরচ বহন করতে হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এবং ফের পরীক্ষার সিদ্ধান্তের খবর আসে পরীক্ষার পরেই। পরিবারের বক্তব্য, সেই সিদ্ধান্ত প্রদীপকে গভীর ভাবে হতাশ করেছিল। ১৫ মে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বোন বাবিতা পড়াশোনা থেকে বিরতি নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন।

টেলিভিশনের পর্দায় ছাত্র আন্দোলনের খবর দেখতে দেখতে প্রদীপের বাবা বলেছেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে তিনি কিছুটা স্বস্তি পেয়েছেন। তবে তাঁর দাবি, শুধু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ যথেষ্ট নয়—পুরো ঘটনার সঠিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে আর কোনও পরিবারকে তাঁদের মতো পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে না হয়।

এস অনিতা, ১৭, তামিলনাড়ু

NEET প্রশ্নফাঁসের ধাক্কায় ভেঙেছে স্বপ্ন, হারিয়েছে সন্তান: চার পরিবারের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
S Anitha with her father

এই তালিকার সবচেয়ে পুরনো এবং প্রতীকী নাম এস অনিতা (S Anitha)। তামিলনাড়ুর আরিয়ালুর জেলার বাসিন্দা অনিতা ২০১৭ সালে NEET-এর বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন। দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষায় ১২০০-র মধ্যে ১১৭৬ নম্বর পেয়েও NEET-এর মাধ্যমে মেডিক্যাল আসন পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়েন তিনি।

অনিতা তামিলনাড়ুকে NEET থেকে ছাড় দেওয়ার দাবিতে সুপ্রিম কোর্টে (Supreme Court of India) মামলাও করেছিলেন। ২০১৭ সালের অগস্টে শীর্ষ আদালত রাজ্যে NEET-এর মাধ্যমে মেডিক্যাল ভর্তি প্রক্রিয়া চালানোর নির্দেশ দেয়। এর কিছুদিন পর অনিতার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি তামিলনাড়ু-সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদের জন্ম দেয়।

আরও পড়ুন:  বেসরকারি সংস্থার হাত ধরে সফলভাবে মহাকাশে বিক্রম-১, ইতিহাস গড়ার পথে ভারত

অনিতার পরিবার যে আর্থিক ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে ছিল, তা-ও এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর ভাই মনিরাথিনমের কথায়, বোনের লক্ষ্য ছিল চিকিৎসক হওয়া এবং পরিবারের পরিস্থিতি বদলানো। বর্তমানে তাঁর নামে একটি বিনামূল্যের লাইব্রেরি ও শিক্ষা কেন্দ্র চালান তিনি।

এই চারটি ঘটনা একই ধরনের নয়। প্রত্যেক পড়ুয়ার ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, মানসিক অবস্থা এবং পারিবারিক বাস্তবতা আলাদা ছিল। তাই কোনও একটি কারণকে তাঁদের মৃত্যুর একমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক হবে না। তবে পরিবারের বক্তব্যে পরীক্ষার চাপ, অনিশ্চয়তা, প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ, সিলেবাস পরিবর্তন, কোচিংয়ের খরচ এবং সাফল্যের প্রবল সামাজিক চাপ বারবার উঠে এসেছে।

NEET প্রশ্নফাঁসের ধাক্কায় ভেঙেছে স্বপ্ন, হারিয়েছে সন্তান: চার পরিবারের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
Students stage a demonstration calling for justice for Anitha in September 2017 in Bengaluru

এই বৃহত্তর ছবির সঙ্গে মিলে যাচ্ছে সরকারি পরিসংখ্যানও। NCRB-এর Accidental Deaths and Suicides in India 2024 রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে ছাত্রদের আত্মহত্যার সংখ্যা ২০১৪ সালের ৮,০৬৮ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ১৪,৪৮৮ হয়েছে—প্রায় ৭৯.৬ শতাংশ বৃদ্ধি। ২০২৪ সালে ছাত্রদের আত্মহত্যার ২,০৩২টি ঘটনাকে ‘failure in examination’-এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল; তবে NCRB-এর কারণ-ভিত্তিক তথ্যকে ব্যক্তিগত ঘটনার সরাসরি কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।

এই পরিসংখ্যানের মধ্যেই প্রশ্নফাঁস ও পরীক্ষা বাতিলের সাম্প্রতিক বিতর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। NEET-এর মতো পরীক্ষায় কয়েক লক্ষ নয়, লক্ষ লক্ষ পড়ুয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর করে একটি পরীক্ষার উপর। ফলে প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, পরীক্ষা পরিচালনার স্বচ্ছতা এবং কোনও অনিয়ম হলে ক্ষতিগ্রস্ত পড়ুয়াদের প্রতি প্রশাসনের দায়—সবকিছুই এখন নতুন করে আলোচনায়।

‘ককরোচ’ আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল পরীক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার এবং প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দায়বদ্ধতা। আন্দোলনকারীরা NEET-সংক্রান্ত অনিয়মের কারণে মৃত্যুবরণ করা পড়ুয়াদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণের দাবিও তুলেছিলেন। ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পরে সেই আন্দোলন আপাতত থেমেছে, কিন্তু শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন থামেনি।

অংশিকা, সুফি, প্রদীপ কিংবা অনিতা—চারটি পরিবারের কাছে পরীক্ষা কোনও সাধারণ পরীক্ষা ছিল না। সেটি ছিল ভবিষ্যৎ বদলের রাস্তা। তাঁদের গল্প তাই শুধু চারটি পরিবারের ব্যক্তিগত শোকের কাহিনি নয়; ভারতের প্রতিযোগিতামূলক শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং পড়ুয়াদের মানসিক নিরাপত্তা কতটা জরুরি, সেই প্রশ্নও ফের সামনে এনে দিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগে একটি রাজনৈতিক অধ্যায়ের ইতি হলেও, পরিবারগুলির প্রত্যাশা একটাই—আর কোনও পড়ুয়ার স্বপ্ন যেন একটি ভেঙে পড়া পরীক্ষাব্যবস্থার ভারে চাপা না পড়ে।

---Advertisement---

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment