নয়াদিল্লি: সংসদ অভিযান, পুলিশের বাধা, দিনভর ধরনা-বিক্ষোভ এবং রাতে রাহুল গান্ধী সহ বিরোধী এমপিদের চ্যাংদোলা করে প্রিজন ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়া। ঘটনাবহুল মঙ্গলবার একের পর এক এমন দৃশ্যই দেখল দিল্লি। আর গোটা আন্দোলন পর্বের অভিমুখ থাকল একজনেরই দিকে—জ্ঞানেশ কুমার। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হল রাজধানীর রাজপথ। নেতৃত্বে, রাহুল গান্ধী। মিছিলের সামনে থাকলেন। পুলিশের মুখোমুখি দাঁড়ালেন, ব্যারিকেডের উপর উঠে পড়লেন, আর তারপর ধরনায় বসলেন। হাতে ধরা থাকল প্ল্যাকার্ড—‘জ্ঞানেশ ইটস ডান ব্রো’। স্তব্ধ হল অশোক রোড, রফি মার্গ, সংসদ মার্গ সহ অফিসপাড়া।
লোহার ব্যারিকেড, হাজারো কেন্দ্রীয় বাহিনীর মানব প্রাচীর, বডি ক্যামেরায় বিক্ষোভকারীদের গতিবিধি রেকর্ডিং, জল কামান—কিছুই এদিন আটকাতে পারেনি সম্মিলিত বিরোধীদের প্রতিবাদকে। নজরকাড়া বিষয় হল, এই বিক্ষোভে যোগ দিল ওড়িশার নবীন পট্টনায়কের দল বিজু জনতা দলও। সংসদ মার্গে মল্লিকার্জুন খাড়্গে, রাহুল, প্রিয়াঙ্কা, অখিলেশ যাদব, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, মহুয়া মৈত্র, সৌগত রায়, সুপ্রিয়া সুলে, সঞ্জয় রাউতদের সম্মিলিত স্লোগান উঠল, ‘জ্ঞানেশ কুমার ইস্তফা দো’, ‘ভোট চোর কাঁহা মিলেগা/বিজেপিকে দপ্তর মে’, ‘জ্ঞানেশ কুমার চোর হ্যায়’। আরএসএসের খাকি হাফপ্যান্ট আর সাদা জামায় জ্ঞানেশ কুমারের ছবি তৈরি করে মিছিলে যোগ দিলেন যুব কংগ্রেসের কর্মীরা। সংসদ ভবনের মকর দ্বারের সামনে জড়ো হয়ে কিছুক্ষণ চলল এমপিদের ধরনা। তারপর পরিবহণ ভবনের দিকের গেট দিয়ে সংসদ ভবন থেকে বেরল মিছিল। পৌঁছে গেল আকাশবাণী ভবনের সামনে। নির্বাচন সদন আর মাত্র ১৫০ মিটার। তবে ওই পর্যন্তই। আটকে দেওয়া হল বিক্ষোভ প্রদর্শনকারী প্রায় তিনশো জনপ্রতিনিধিকে। কিন্তু সেখানেই মাটিতে বসে পড়লেন সাংসদরা। হলুদ পাঁচস্তরীয় সাড়ে পাঁচ ফুট লোহার ব্যারিকেডের উপর লাফিয়ে উঠে পড়লেন রাহুল। তাঁর দেখাদেখি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, এমনকি শাড়ি পরে প্রিয়াঙ্কাও। পুলিশের সঙ্গে বেধে গেল ধস্তাধস্তি।
সকাল সাড়ে ১০ টা থেকে পৌনে দুটো। বিক্ষোভকারী সাংসদদের আটক করে তোলা হল পুলিশ বাসে। নিয়ে যাওয়া হল সংসদ মার্গ থানায়। পরে অবশ্য ছেড়েও দেওয়া হল। তবে পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে আকাশবাণী ভবনের তিন নম্বর লোহার গেট জোর করে খুলে ঢুকে পড়েছিলেন রাহুল-প্রিয়াঙ্কা। বসে পড়েন প্রাচীন বট গাছের নীচে। শুরু হয় ‘সত্যাগ্রহ’। যোগ দেন ডেরেক ও’ব্রায়েন, মহুয়া মৈত্র। রাহুল স্পষ্ট জানিয়ে দেন, ‘জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত ধরনা চলবে। কেন উনি দেখা করতে চাইছেন না? কীসের ভয়?’ একইসঙ্গে দিলেন হুংকার—‘বিজেপিকে স্রেফ প্রতিরোধ নয়। খতম করে দেব। বিরোধীরা এ ব্যাপারে একজোট। গণতন্ত্র রক্ষাই আমাদের লক্ষ্য। মোদি-শাহ, মোহন ভাগবত, জ্ঞানেশ কুমাররা দেশদ্রোহী। কেউ পার পাবেন না।’ চাপ বাড়াতে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চেয়ে দেওয়া হল চিঠিও। দুপুর গড়িয়ে বিকাল, তারপর রাত। আকাশবাণী ভবন থেকে রাহুল, প্রিয়াঙ্কা, মহুয়াদের টেনেহিঁচড়ে প্রিজন ভ্যানে তুলল পুলিশ। নিয়ে যাওয়া হল কিংসওয়ে ক্যাম্প থানায়। ভ্যানের বাইরে তখনও উত্তাল সড়ক, সমর্থক, আম জনতা। রাতে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। চাপে পড়ে কমিশন রাতেই জানায়, রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাতে জ্ঞানেশ কুমারের আপত্তি নেই। তবে নিয়ম মেনে। সংসদের অ্যানেক্স বিল্ডিংয়ে ২৪০ জন জনপ্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাৎ সম্ভব নয়। তাহলে জ্ঞানেশ নন, কমিশনের কোনো আধিকারিক যেতে পারেন। এই প্রস্তাবে রাজি হননি সাংসদরা। আজ, বুধবার ফের বিক্ষোভ দেখাবেন বিরোধী জোটের এমপিরা।