আসামে বন্যার বিভীষিকা, মৃত ৭৫, জল নামলেও বিপর্যয় কাটেনি

By Suman Debnath

July 29, 2026 4:31 PM

আসামে বন্যার বিভীষিকা, মৃত ৭৫, জল নামলেও বিপর্যয় কাটেনি


গত ২৪ ঘণ্টায় আসামে বন্যায় ৭ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়েছে। শেষ পাওয়া খবরে, চলতি বছরের বন্যায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ৭৫-এ। বন্যার জল ধীরে ধীরে নামতে শুরু করলেও বিপর্যয়ের অন্ধকারে এখনও ডুবে রয়েছে এই রাজ্য। এখনও ৭টি জেলার ৬২২টি গ্রাম বন্যাকবলিত। ৭ জেলায় ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা ৩ লক্ষ ৩২ হাজার। মৃতদের পরিবারের জন্য রাজ্য সরকারের তরফে ৯ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করা হয়েছে।

আসামে জল নামার সঙ্গে সঙ্গে সামনে আসছে ভয়াবহ ধ্বংসের ক্ষত। রাজ্যের বিস্তীর্ণ এলাকায় এখনও জলমগ্ন কয়েকশো গ্রাম। ভেঙে পড়েছে বাড়িঘর, নষ্ট হয়ে গিয়েছে সমস্ত ফসল, কৃষিজমি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গবাদি পশু – সবকিছুই বন্যার তাণ্ডবে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন লক্ষ লক্ষ মানুষ।বহু মানুষের কাছে ঘরে ফেরা এখন অসম্ভব।

আসাম রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নতুন ৭টি মৃত্যুর ঘটনাই ঘটেছে শিবসাগর জেলার নজিরা এলাকায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চরাইদেও জেলা, যেখানে প্রায় ১ লক্ষ ৪৩ হাজার মানুষ এখনও বন্যার কবলে। শিবসাগরে প্রায় ৯৭ হাজার এবং যোরহাটের ৫৭ হাজারেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত।

এছাড়া গোলাঘাট, নগাঁও, শোণিতপুর এবং কামরূপ মেট্রোপলিটনের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও জলমগ্ন। বহু গ্রামে একতলা সমান জল দাঁড়িয়ে রয়েছে। কোথাও কোথাও তারও বেশি। হাজার হাজার পরিবার এখনও গৃহহীন। যাঁরা ঘরে ফিরেছেন, তাঁদের অনেকেরই মাথার ওপর ছাদ ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই। ঘরের আসবাবপত্র, খাদ্যশস্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র— সবই বন্যার জলে ভেসে গিয়েছে। ঘরজুড়ে জমে থাকা পুরু কাদা সরিয়েই আবার নতুন করে জীবন শুরু করার লড়াইয়ে নেমেছেন তাঁরা।

আরও পড়ুন:  ধারচুলায় ধস, ফের বন্যার আশঙ্কা নেপালে

এই রাজ্যে বর্তমানে ৮১টি ত্রাণ শিবিরে ৩২ হাজার ৪৭৭ জন আশ্রয় নিয়েছেন। আরও ৩৪টি ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্র থেকে দুর্গতদের কাছে খাদ্য, পানীয় জল ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। সেনাবাহিনী, বায়ুসেনা, জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, রাজ্য বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, দমকল, চিকিৎসক দল এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা দিনরাত উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে উজানের বহু এলাকায় এখনও নৌকোই একমাত্র ভরসা।  

বন্যার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে। প্রায় ৪৫ হাজার হেক্টরেরও বেশি কৃষিজমি এখনও জলের তলায়। অসংখ্য গবাদি পশুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বহু স্কুল, কলেজ ও অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শিক্ষা ব্যবস্থা বিপর্যস্ত। ত্রাণ শিবিরে থাকা শিশুদের মানসিক চাপ কমাতে পড়াশোনা ও খেলাধুলার বিশেষ ব্যবস্থা করেছে রাজ্য সরকার। শিবসাগর ও চরাইদেও জেলার পড়ুয়াদের জন্য বিনামূল্যে স্কুল ইউনিফর্ম, পাঠ্যপুস্তক এবং উচ্চমাধ্যমিক থেকে স্নাতকোত্তর স্তরের ছাত্রছাত্রীদের বই কেনার জন্য আর্থিক সহায়তার কথাও ঘোষণা করা হয়েছে।

পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য একাধিক আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করেছে আসাম সরকার। বন্যায় মৃতদের পরিবারকে মোট ৯ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। সরকারি অনুদানের পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে অতিরিক্ত ৫ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে। ক্ষতিপূরণ পাওয়ার নিয়মও শিথিল করা হয়েছে, যাতে দুর্গত পরিবারগুলি দ্রুত সাহায্য পেতে পারে। বন্যায় নিখোঁজ কোনও ব্যক্তির দেহ এক মাসের মধ্যে উদ্ধার না হলেও তাঁর পরিবার একই পরিমাণ আর্থিক সহায়তা পাবে।

আরও পড়ুন:  অরুণাচল সীমান্তে ভারত-চিন সংঘাত! উত্তেজনা এখনও অব্যাহত, জানালেন আইটিবিপি প্রধান

এছাড়া সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত চার জেলা শিবসাগর, চরাইদেও, যোরহাট এবং গোলাঘাটের গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে অন্তর্বর্তীকালীন ১৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। আগামী ৩ আগস্ট থেকে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর, কৃষিজমি, গবাদি পশু ও মৎস্যচাষের ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন শুরু হবে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই পরবর্তী পর্যায়ে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।

জল নামতে শুরু করলেও আসামের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পুনর্বাসন। দু’দিন আগেও প্রায় সাড়ে চার লক্ষ মানুষ বন্যার কবলে ছিলেন। জল নামায় সেই সংখ্যা কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার থেকে এখনও বহু দূরে। লক্ষাধিক মানুষের মাথার ওপর ছাদ ফিরিয়ে দেওয়া, কৃষিজমি পুনরুদ্ধার, জীবন-জীবিকা এবং সংক্রামক রোগের মোকাবিলা- এই রাজ্যের মানুষের সামনে এক দীর্ঘ লড়াই অপেক্ষা করছে। প্রকৃতির এই ভয়াবহ আঘাত থেকে ঘুরে দাঁড়াতে প্রশাসনের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন পরিকল্পনাই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment