ছাঁকনিতে প্রায় ১০ কোটি ভোটার, মিলল মাত্র ১৬৪০ বিদেশি! তা হলে এসআইআরে ‘অনুপ্রবেশকারী’ কোথায়?

By Suman Debnath

October 29, 2026 9:30 PM

ছাঁকনিতে প্রায় ১০ কোটি ভোটার, মিলল মাত্র ১৬৪০ বিদেশি! তা হলে এসআইআরে ‘অনুপ্রবেশকারী’ কোথায়?


ভোটার তালিকা শুদ্ধ করার নামে দেশ জুড়ে চলছে বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর (Special Intensive Revision, SIR)। শুরু থেকেই একটি লক্ষ্য বারবার উঠেছে। তালিকা থেকে বিদেশি নাগরিক বা অনুপ্রবেশকারীদের বাদ দেওয়া।

এবার প্রথম একটি হিসাব সামনে এল। হিন্দুস্তান টাইমসের (Hindustan Times) রিপোর্ট বলছে, ছয় রাজ্যে এসআইআরের সময় মোট ১৬৪০ জনকে বিদেশি নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা গিয়েছে। উল্লেখ্য, ওই ছয় রাজ্যের মোট ভোটার প্রায় ৯.৮৬ কোটি। অর্থাৎ বিদেশি হিসেবে চিহ্নিতরা ভোটারদের মাত্র ০.০২ শতাংশ।

সংখ্যাটা নিতান্তই ছোট। আর তাতেই উঠে যাচ্ছে একটা বড় প্রশ্ন।

কোথায় কত জন অনুপ্রবেশকারী?

অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যায় সবচেয়ে এগিয়ে কর্নাটক (Karnataka)। সেখানে ভোটার তালিকা থেকে ৭১৬ জনকে বাদ দেওয়ার জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫৪৫ জন নেপালের (Nepal) নাগরিক, সবাই ধরা পড়েছেন বেঙ্গালুরু উত্তর (Bengaluru North) এলাকায়।

কেরলে (Kerala) বিদেশি নাগরিকত্বের কারণে চিহ্নিত মানুষ প্রায় ৫০০। গোয়ায় (Goa) বিদেশি পাসপোর্টধারী ভোটার মিলেছে ৪১৯ জন। ঝাড়খণ্ডে (Jharkhand) মিলেছেন মাত্র তিন জন। তিন জনই আফগানিস্তানের (Afghanistan) নাগরিক। মেঘালয়ে (Meghalaya) পাওয়া গিয়েছে দু’জনকে। তাঁরা নেপালি বংশোদ্ভূত পুরুষ, যাঁদের স্ত্রী ভারতীয়। মিজোরামে (Mizoram) কোনও বিদেশি পাওয়া যায়নি।

নাম বাদ গেল লক্ষ লক্ষ

এই ছয় রাজ্যে বাদ পড়া নামের সংখ্যা কিন্তু বিশাল। কর্নাটকের চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে প্রায় ১ কোটি (৯৯.৩ লক্ষ) নাম। ঝাড়খণ্ডের খসড়া তালিকা থেকে বাদ ৪৩.৬ লক্ষ। কেরলে ৮.৯ লক্ষ, মেঘালয়ে ১.৬ লক্ষ, গোয়ায় ১.২ লক্ষ। মিজোরামে প্রায় ৩৯ হাজার।

এখানেই একটি জরুরি তফাত। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া আর বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত হওয়া এক জিনিস নয়। বাদ পড়া নামের বড় অংশই মৃত, স্থানান্তরিত বা দ্বৈত নাম হতে পারে। সেই হিসাব আলাদা।

আরও পড়ুন:  মিজোরামে পথ দুর্ঘটনায় পিআইবি ও দূরদর্শনের তিন আধিকারিকের মৃত্যু, আহত ২

বাকি রাজ্যের হিসাব কোথায়?

হিন্দুস্তান টাইমস ২৬টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকদের কাছে প্রশ্ন পাঠিয়েছিল। উত্তর এসেছে ১১টি থেকে। ছয়টি রাজ্য সংখ্যা দিয়েছে। চারটি জানিয়েছে, এমন তথ্য তারা রাখেনি। ওড়িশা (Odisha) জানিয়েছে, এমন কেস তারা পেয়েছে। কিন্তু সংখ্যা লিখে রাখা হয়নি।

কমিশনের এক আধিকারিকের কথা অনুযায়ী, রাজ্যগুলিকে আলাদা করে এই তথ্য সংগ্রহ করতে কখনও বলাই হয়নি। রাজ্যওয়ারি বা সর্বভারতীয় হিসাবও নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of India) কাছে নেই। এমন কেস উঠলে তা গিয়েছে অনুপস্থিত, স্থানান্তরিত, মৃত, দ্বৈত ও অন্যান্য (ASDDO) তালিকার ঘরে।

অর্থাৎ ১৬৪০ গোটা দেশের হিসাব নয়। পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরপ্রদেশ ও তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যের কোনও সংখ্যা এই তালিকায় নেই।

বিহার কী বলেছিল?

২০২৫ সালে বিহারে প্রথম দফার এসআইআর শেষে একটি বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছিল, প্রায় ৭.৪২ কোটি ভোটারের চূড়ান্ত তালিকায় বিদেশি বলে চিহ্নিত পাওয়া গিয়েছিল প্রায় ১০৮৭ জনকে। এক সম্পাদকীয় বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, তাঁদের বেশির ভাগই নেপালের নাগরিক।

ছবিটা এ বারের হিসাবের সঙ্গে অদ্ভুত ভাবে মেলে। সংখ্যা সামান্য। আর বিদেশিদের একটা বড় অংশ নেপালি।

রাজনীতির মঞ্চে সংখ্যাটা কোথায় দাঁড়াচ্ছে?

বৃহস্পতিবারই কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ (Jairam Ramesh) এই হিসাব নিয়ে সরব হয়েছেন। তাঁর প্রশ্ন, প্রায় ১০ কোটি মানুষকে এসআইআরের মধ্য দিয়ে নিয়ে গিয়ে মাত্র ১৬০০ বিদেশি মিলল কেন। তাঁর দাবি, বাকি ২০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল তথ্য দেয়নি, কারণ কমিশন চায়ইনি। তাঁর অভিযোগ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বারবার অনুপ্রবেশকারীর প্রসঙ্গ আর এসআইআরকে মিলিয়ে মিথ্যা বলেছেন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের অবিলম্বে অপসারণও চেয়েছেন তিনি।

আরও পড়ুন:  মোদীর পোস্ট মুছে ফেলেছিল মেটা, সেই বিতর্কের আবহেই প্রধানমন্ত্রীর অ্যাকাউন্টে বিশেষ নজরদারির কথা জানাল মেটা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) আগে একাধিক বার বলেছেন, অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করা, তালিকা থেকে বাদ দেওয়া ও বিতাড়ন, এই নীতিই তাঁর দল দীর্ঘদিন ধরে মানে। তাঁর বক্তব্য ছিল, তালিকায় অনুপ্রবেশকারী থাকলে সংবিধানের মূল চেতনা ক্ষুণ্ণ হয়। শরণার্থী ও অনুপ্রবেশকারীর মধ্যে তফাতও টেনেছিলেন তিনি।

এই গোটা বিষয়টিতে আইনি জটিলতাও আছে। মে মাসে সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court) এসআইআরের বৈধতা বহাল রেখেছে। কিন্তু একই সঙ্গে জানিয়েছে, কে ভারতীয় নাগরিক, তা ঠিক করার এক্তিয়ার কমিশনের নেই। সন্দেহজনক কেস পাঠাতে হয় উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে। সেই কেসগুলির পরিণতির হিসাব কিন্তু এখনও প্রকাশ্যে আসেনি।

পশ্চিমবঙ্গের প্রাসঙ্গিকতা

এই ছয় রাজ্যের তালিকায় পশ্চিমবঙ্গ নেই। তাই এ রাজ্যে কতজন বিদেশি মিলল, সে হিসাবও এই রিপোর্টে নেই।

কিন্তু বাংলার অভিজ্ঞতা আলাদা করে তাকানোর মতো। রাজ্যের ভোটার তালিকা থেকে এসআইআরের পর বাদ গিয়েছে প্রায় ৯১ লক্ষ (৯০.৮২ লক্ষ) নাম। এর মধ্যে প্রায় ২৭ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছে আধিকারিকদের বিচার-প্রক্রিয়ায়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গড়া ১৯টি আপিল ট্রাইব্যুনালে (appellate tribunal) তাঁদের আবেদন গিয়েছে। জুলাইয়ের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, এপ্রিলের বিধানসভা ভোটে ভোট দিতে পারেননি প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষ। তাঁরা তখনও রায়ের অপেক্ষায়।

এর পর নজর কোথায়?

ঝাড়খণ্ডের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের কথা ৩০ নভেম্বর। তখন সেখানকার হিসাবও বদলাতে পারে। বিরোধীরা চাইছে রাজ্যওয়ারি পূর্ণ তথ্য। কমিশনের হাতে সেই তথ্য আদৌ আছে কি না, প্রশ্ন সেটাই।

আসল প্রশ্ন শুধু কতজন বিদেশি মিলল, তা নয়। কতজন বৈধ ভোটার ভুলে বাদ পড়লেন এবং তাঁরা ফিরলেন কি না, তার উত্তরও ততটাই জরুরি।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment