ভয়াবহ হড়পা বানের তিন দিন পরেও নেপালে ধ্বংসস্তূপের নিচে চলছে নিখোঁজদের সন্ধান। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের হিসাবে, মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬২৬-এ পৌঁছেছে। অন্যদিকে তিব্বতে কমপক্ষে ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৫৪জন নিখোঁজ রয়েছেন। নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে এখনও নিখোঁজ কমপক্ষে ১৯২৪ জন মানুষ। তাঁদের মধ্যে কমপক্ষে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের সর্বশেষ হিসাবে, এখনও ৩২০ জন ভারতীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ৮৫ জন ভারতীয়কে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে নেপালের পর্যটন মন্ত্রক। ফলে নিখোঁজ ভারতীয়দের পরিবারগুলির উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে।
বিপর্যয়ের পর নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে ভারত-সহ বিভিন্ন দেশ। ভারত ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছে এবং উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতির খোঁজ নিয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও নেপালকে প্রয়োজনীয় সাহায্যের প্রস্তাব দিয়েছেন।
এদিকে বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর দুর্যোগ ত্রাণ তহবিলেও বিপুল অনুদান জমা পড়ছে। নেপালের অর্থ মন্ত্রকের হিসাব অনুযায়ী, বুধবার দুপুর থেকে বৃহস্পতিবার মধ্যরাত পর্যন্ত মাত্র ৩৬ ঘণ্টায় ১০টি ব্যাঙ্কের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে ১৯১ কোটি নেপালি রুপির বেশি অনুদান জমা পড়েছে, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১২০ কোটি টাকা। তহবিলে আগে থাকা অর্থ মিলিয়ে মোট পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০৯ কোটি নেপালি রুপি, ভারতীয় মুদ্রায় ২৫৬ কোটি টাকা। রাসুয়া ও নুয়াকোটের জন্য এক কোটি নেপালি টাকা করে এবং ধাদিংয়ের জন্য ৫০ লক্ষ টাকা আর্থিক সাহায্যও ঘোষণা করেছে কাঠমান্ডু।
বুধবার তিব্বত সীমান্ত লাগোয়া নেপালের রাসুয়া জেলায় ভোটেকোশী নদীতে হড়পা বান নামে। হিমবাহ-ধসের জেরে তিব্বত থেকে নেমে আসা জল, বরফ, পাথর ও কাদার প্রবল স্রোতে গ্রামের পর গ্রাম ভেসে যায়। রাসুয়া, নুয়াকোট-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় বাড়িঘর, রাস্তা, সেতু ও বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সীমান্তের ওপারে তিব্বতের জিরং এলাকাতেও বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়। এখনও বহু মানুষ নিখোঁজ থাকায় ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।
উদ্ধার ও তল্লাশিতে নেপাল পুলিশ, সেনা এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর প্রায় ১৪,৮২৯ জন সদস্যকে নামানো হয়েছে। হেলিকপ্টারের সাহায্যে দুর্গত এলাকা থেকে বহু মানুষকে সরিয়ে আনা হয়েছে। জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের হিসাবে, এখনও পর্যন্ত ৩,৭৪২ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে যোগাযোগ ব্যবস্থা, রাস্তা ও সেতু ভেঙে পড়ায় দুর্গম বহু এলাকায় এখনও উদ্ধারকারীরা পৌঁছতে পারেননি। আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের প্রাথমিক হিসাবে, এই দুর্যোগে অন্ততপক্ষে ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
নিখোঁজ ভারতীয়দের মধ্যে তীর্থযাত্রী, পর্যটক এবং বিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মীরাও রয়েছেন। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হওয়ায় দুর্গত এলাকায় থাকা ভারতীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ভারতীয় দূতাবাস নেপাল প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের খোঁজে তল্লাশি চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা। ইতিমধ্যেই উদ্ধার হওয়া ভারতীয়দের দেশে ফেরানোর ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
এদিকে বুধবারের বিপর্যয়ের ক্ষত শুকোনোর আগেই নেপালের সামনে ফের নতুন বিপদ। বৃহস্পতিবার চিন নেপালকে সতর্ক করে জানায়, তিব্বতের ছোকেন খোলা ও পুরেপি সাংপো নদীর সংযোগস্থলে পাথর, কাদা ও বরফ জমে একটি অস্থায়ী হ্রদ তৈরি হয়েছে। বুধবারের হিমবাহধসের পরে নদীর খাতে জমে থাকা বিপুল ধ্বংসাবশেষ অনেক জায়গায় অস্থায়ী বাঁধের মতো কাজ করছে। জলের চাপ বাড়লে সেই বাধ ভেঙে ফের বিপুল জল, পাথর ও কাদার স্রোত নীচের দিকে নেমে আসতে পারে।
শুক্রবার ওই হ্রদ উপচে পড়তে শুরু করেছে বলে খবর মেলার পর নতুন করে সতর্কতা জারি হয়। নদীর জলস্তর বাড়তে থাকায় সাময়িকভাবে উদ্ধারকাজ বন্ধ করে উদ্ধারকারী দল ও গাড়িগুলিকে নিরাপদ জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়। নীচু এলাকা থেকেও বাসিন্দাদের সরিয়ে দেওয়া হয়। তবে হ্রদটি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে কি না, নেপালের পক্ষ থেকে তা এখনও নিশ্চিত করা হয়নি। চিনা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেই হ্রদ উপচে পড়ার খবর পেয়েছে বলে জানিয়েছে রাসুয়া জেলা প্রশাসন।
নতুন এই জলাধারটি জিরং বন্দরের উজানে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে এবং প্রায় ২,৯৫০ মিটার উচ্চতায় তৈরি হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। ফলে সেটি ভেঙে পড়লে ইতিমধ্যেই বিধ্বস্ত রাসুয়া-সহ নীচের এলাকায় ফের প্রবল স্রোত নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। ভোটেকোশী ও ত্রিশূলী নদীর জলস্তরের উপর নজর রাখছে নেপাল প্রশাসন। নতুন বিপদের আশঙ্কায় উদ্ধারকাজের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদেরও সতর্ক করা হয়েছে। উদ্ধারকাজ চালানোর পাশাপাশি তাই সম্ভাব্য নতুন হড়পা বান মোকাবিলাতেও সর্বোচ্চ সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে।
Leave a Comment