৪৭ বছর পরও দর্শক হৃদয়ে উত্তম কুমার

By Suman Debnath

July 25, 2026 4:40 PM

৪৭ বছর পরও দর্শক হৃদয়ে উত্তম কুমার


বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা, ‘মহানায়ক’ নামে খ্যাত উত্তম কুমারের আজ (২৫ জুলাই) ৪৭তম মৃত্যুবার্ষিকী। মৃত্যুর প্রায় পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও তাঁর অভিনয়ের জাদু ও জনপ্রিয়তা এতটুকুও ম্লান হয়নি। সময়ের পরিবর্তন আর প্রজন্মের ব্যবধান পেরিয়েও দর্শকের হৃদয়ে তিনি আজও সমানভাবে অম্লান।


উত্তম কুমারের প্রকৃত নাম অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায়। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতার ভবানীপুরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় এবং মা চপলা দেবী। নিম্নবিত্ত পরিবারের বড় সন্তান হওয়ায় অল্প বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল তাঁকে।


১৯৪৬ সালে কলকাতা বন্দরে কেরানির চাকরি নেন উত্তম কুমার। সে সময় তাঁর মাসিক বেতন ছিল ২৭৫ টাকা। চাকরির পাশাপাশি অভিনয়ের স্বপ্নকে লালন করে থিয়েটারে নিয়মিত কাজ করতেন এবং চলচ্চিত্রে সুযোগ পাওয়ার জন্য নিরলস চেষ্টা চালিয়ে যান।


অবশেষে ১৯৪৭ সালে এক বন্ধুর সহায়তায় ‘মায়াডোর’ নামে একটি হিন্দি ছবিতে অভিনয়ের সুযোগ পান তিনি। পাঁচ দিনের কাজের জন্য প্রতিদিন পাঁচ সিকি করে পারিশ্রমিক পেলেও ছবিটি শেষ পর্যন্ত মুক্তি পায়নি। তবে সেখান থেকেই শুরু হয় বাংলা চলচ্চিত্রের এক অনন্য নক্ষত্রের পথচলা।


এরপর তাঁর প্রথম মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা ছিল দৃষ্টিদান। সেখানে তিনি নিজের আসল নাম অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু ছবিটি সফল হয়নি। পরের ছবি কামনাতেও দর্শকের মন জয় করতে পারেননি। সে সময় তিনি নিজের নাম পরিবর্তন করে উত্তম চ্যাটার্জি রাখেন। পরে আবার অরূপ কুমার নামেও কয়েকটি ছবিতে অভিনয় করেন। কিন্তু সাফল্য তখনও অধরা ছিল।

আরও পড়ুন:  ব্রিটিশ বিরোধী বনেদি পরিবার, দুর্গাপুজোয় সাদা পাঁঠাবলির প্রথা!


বারবার ব্যর্থ হয়ে সমালোচনা ও উপহাসের শিকার হলেও তিনি হাল ছাড়েননি। শেষ পর্যন্ত বসু পরিবার ছবিতে অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকের নজর কাড়েন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক সফল ছবি তাঁকে বাংলা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়ক এবং পরে ‘মহানায়ক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।


১৯৪৮ সালে অভিনয়জীবন শুরু করে টানা তিন দশকেরও বেশি সময় বাংলা চলচ্চিত্রে রাজত্ব করেন উত্তম কুমার। স্বাভাবিক অভিনয়, নিখুঁত সংলাপ, অসাধারণ ব্যক্তিত্ব এবং পর্দায় শক্তিশালী উপস্থিতির জন্য তিনি দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নেন। তিনি শুধু একজন নায়ক ছিলেন না, মধ্যবিত্ত বাঙালির স্বপ্ন, ভালোবাসা, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।


১৯৮০ সালের আজকের দিনে মাত্র ৫৩ বছর বয়সে পৃথিবীকে বিদায় জানান এই কিংবদন্তি অভিনেতা। তবে তাঁর মৃত্যু হলেও শেষ হয়নি তাঁর জনপ্রিয়তা। আজও টেলিভিশনে তাঁর কোনো সিনেমা প্রচার হলে দর্শক আগ্রহ নিয়ে দেখেন। নতুন প্রজন্মও তাঁর অভিনয়, সংলাপ ও গান সমান মুগ্ধতায় উপভোগ করে।


মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলা চলচ্চিত্র অঙ্গন ও অসংখ্য ভক্ত গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছেন মহানায়ককে। চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতা নন, বাংলা সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রের এক অনন্য প্রতীক।


উত্তম কুমারকে নিয়ে প্রকাশিত উত্তম কুমার: আ লাইফ ইন সিনেমা বইয়ে লেখক সায়নদেব চৌধুরী বলেছেন, উত্তম কুমারের অভিনয়ের মধ্য দিয়েই বাংলা জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে আধুনিকতার নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল। তাঁর অভিনীত চরিত্রগুলো শুধু প্রেমের গল্পে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সমাজ, নৈতিকতা, আত্মসম্মান ও মানবিক মূল্যবোধের কথাও তুলে ধরেছে।

আরও পড়ুন:  আবারও রহস্যের জাল বিস্তার করতে আসছে দৃশ্যম রূপী অজয়


বিশ্লেষকদের মতে, উত্তম কুমারের সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল বাস্তব জীবনের সঙ্গে এর গভীর সংযোগ। তাঁর ছবিতে প্রেমের পাশাপাশি বেকারত্ব, দারিদ্র্য, শ্রেণিবৈষম্য, পারিবারিক টানাপোড়েন, সামাজিক সংকট এবং মানুষের সংগ্রামের গল্পও উঠে এসেছে। এ কারণেই তাঁর সিনেমা সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে আজও সমান প্রাসঙ্গিক।


দীর্ঘ অভিনয়জীবনে তিনি সময়ের সঙ্গে নিজেকেও বদলে নিয়েছিলেন। শুধু প্রেমের নায়ক হয়ে থাকেননি; চিকিৎসক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, আইনজীবী, শিল্পপতি, শিল্পীসহ নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে নিজের বহুমুখী প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর চরিত্রগুলোতে দায়িত্ববোধ, আত্মবিশ্বাস ও মানবিকতার প্রতিফলন ছিল স্পষ্ট।


চলচ্চিত্র গবেষকদের মতে, উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তার মূল কারণ শুধু তাঁর অভিনয় নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবন, সমাজ এবং সময়ের সঙ্গে তাঁর গভীর সংযোগ। তাই তিনি যেমন ছিলেন রুপালি পর্দার উজ্জ্বল তারকা, তেমনি ছিলেন পাশের বাড়ির পরিচিত একজন মানুষ।


এ কারণেই মৃত্যুর ৪৭ বছর পরও উত্তম কুমার শুধু একজন অভিনেতা নন, বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি এক অমর কিংবদন্তি। তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং অসংখ্য কালজয়ী সিনেমা আজও প্রজন্মের পর প্রজন্মের দর্শককে সমানভাবে মুগ্ধ করে যাচ্ছে।


আমার বাঙলা/ রাব্বি

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment