---Advertisement---

পানিশূন্য গাজীখালী, বাড়ছে দুর্ভোগ | Amar Bangla BANGLADESH

By Suman Debnath

August 3, 2026 12:25 PM

পানিশূন্য গাজীখালী, বাড়ছে দুর্ভোগ | Amar Bangla BANGLADESH

---Advertisement---


ভরা বর্ষা মৌসুমে যেখানে নদী থাকার কথা ছিল পানিতে থইথই, সেখানে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্ষার শুরুতেই পানিশূন্য হয়ে পড়েছে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঐতিহাসিক গাজীখালী নদী। কোথাও কোথাও সামান্য বৃষ্টির পানি জমে থাকলেও তা ঢেকে গেছে কচুরিপানা ও সাটুরিয়া বাজারের বর্জ্যের স্তূপে। ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ এখন সম্পূর্ণ বন্ধ।

​গাজীখালীর শুকনো বুকে হেঁটে চলতে চলতে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন নদীপাড়ের কৃষক মোঃ আব্দুল। তিনি বলেন, “গাঙ কাটার পর থিকা পানি আহে না। ছোটবেলায় এই নদীতে ট্রলার আর বড় বড় নৌকা চলতে দেখছি। বর্ষায় নদী ভইরা যাইত, অনেক স্রোত থাকত। কত মাছ মারতাম! কয়েক বছর আগে নদী কাটলেও ঠিকমতো কাটা হয় নাই।”


সাটুরিয়া উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত গাজীখালী নদীর উৎপত্তি মূলত গোপালপুর এলাকার ধলেশ্বরী নদী থেকে। এরপর এটি ধামরাই হয়ে বংশী নদীতে গিয়ে মিশেছে। একসময় বর্ষা মৌসুমে ধলেশ্বরী থেকে বিপুল পরিমাণ পানি গাজীখালীতে প্রবেশ করত। নদীর এই পানির ওপর নির্ভর করেই স্থানীয় মানুষের কৃষিকাজ, মাছ ধরা ও জীবন-জীবিকা পরিচালিত হতো।

​স্থানীয় প্রবীণদের মতে, শত বছরেরও বেশি সময় আগে এই গাজীখালী নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল ঐতিহ্যবাহী সাটুরিয়া বাজার। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বড় বড় নৌকায় করে ব্যবসায়ীরা আসতেন এই বাজারে। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে নদীটি এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে। বর্তমানে গোপালপুর থেকে সাটুরিয়া বাজার পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এবং সাটুরিয়া থেকে ধামরাইয়ের বারবারিয়া এলাকা পর্যন্ত নদীপথের অধিকাংশ স্থানই প্রায় শুকিয়ে গেছে। পুরো নদীজুড়ে কচুরিপানার জট সৃষ্টি হওয়ায় পানি থাকলেও তা বোঝার উপায় নেই।



সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ছোট নদী, খাল ও জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া, সদর, সিঙ্গাইর এবং ঢাকার ধামরাইয়ের সীমান্তবর্তী প্রায় ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ গাজীখালী নদী পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই চার অংশে নদী খননে মোট ব্যয় হয় প্রায় ৪০ কোটি টাকা।


​এর মধ্যে শুধু সাটুরিয়া অংশেই দুই দফায় নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে সরকারের ব্যয় হয় প্রায় ১৬ কোটি টাকা। প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী, নদী দুই মিটার গভীর করে খনন এবং তলদেশে ২৬ মিটার ও ওপরের অংশে স্থানভেদে ৫০ থেকে ৬০ মিটার প্রশস্ত করার কথা ছিল। খননকাজে এক্সকাভেটর (ভেকু) ব্যবহারেরও নির্দেশনা ছিল।


​তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের পরও নদীর নাব্যতা ফেরেনি। একসময় সাটুরিয়া বাজারের খাদ্যগুদাম পর্যন্ত গাজীখালী নদীর বিস্তৃতি থাকলেও নদীটি এখন সংকুচিত হয়ে নালায় পরিণত হয়েছে। তাদের দাবি, নদী খননের নামে যথাযথ কাজ না করে সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে।


​সাটুরিয়া বাজারের ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, “ছোটবেলায় বর্ষার শুরুতেই গাজীখালীতে নতুন পানি আসত। নতুন পানিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত, নদীতে শুশুকও দেখতাম। কয়েক বছর আগে নদী খনন করে শুধু মাটি বিক্রি করেই অনেকে লাভবান হয়েছে, নদীর কোনো লাভ হয় নাই।”



নদীর বিভিন্ন অংশে পানির প্রবাহ না থাকা এবং কচুরিপানার ঘন স্তরের কারণে নদীনির্ভর স্থানীয় জেলে পরিবারগুলো চরম সংকটে পড়েছেন। মাছ ধরতে না পেরে অনেকেই বাপ-দাদার পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন।

​উপজেলার রাধানগর মাঝিপাড়া এলাকার প্রবীণ জেলে জ্যোতিন রাজবংশী আক্ষেপ করে বলেন, “আগে নদীতে যেমন পানি আইত, তেমন মাছও পাইতাম। শত শত জেলে এই নদীতে মাছ ধইরা সংসার চালাইত। এখন নদীতে পানিই নাই, মাছ মারুম কেমনে? বাধ্য হয়া অনেক জেলে এখন অন্য পেশায় চলে গেছে।”



এ বিষয়ে জানতে চাইলে মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, “আমি এই কর্মস্থলে যোগদানের আগে গাজীখালী নদীর পুনঃখননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তাই আগের কাজের বিষয়ে মন্তব্য করতে পারব না। তবে বর্তমানে নদীতে পানি না আসার প্রধান কারণ হলো—ধলেশ্বরী নদীর গোপালপুর এলাকার উৎসমুখটি যমুনা নদীর পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। উৎসমুখটি পুনরায় খনন করা গেলে নদীতে আবারও পানির প্রবাহ ফিরিয়ে আনা সম্ভব।”


​সাটুরিয়ার প্রাণ হিসেবে পরিচিত এই নদীটিকে পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে দ্রুত উৎসমুখ খননসহ কার্যকর টেকসই পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।


আমার বাঙলা/ রাব্বি

---Advertisement---

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment