---Advertisement---

বন্যার পানি নামছে, ফুটে উঠছে ধ্বংসস্তূপ ও ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন

By Suman Debnath

July 16, 2026 5:35 PM

বন্যার পানি নামছে, ফুটে উঠছে ধ্বংসস্তূপ ও ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন

---Advertisement---


কক্সবাজারে গত টানা আটদিনের ভয়াবহ বন্যার পানি অবশেষে নামা শুরু করেছে। গত মঙ্গলবার থেকে বৃষ্টি বন্ধ থাকায় বন্যার পানি নামলেও ভেসে উঠছে বানের জলের ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও ক্ষতচিহ্ন। পানি যত কমছে, ততই দৃশ্যমান হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির বিভীষিকাময় চিত্র।

জেলা প্রশাসনের হিসাবে, কক্সবাজারে মোট ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলা।


চকরিয়ায় ৩৫০ কিলোমিটার সড়ক এবং ২০টি সেতু-কালভার্ট, মাতামুহুরীতে ১৯০ কিলোমিটার সড়ক ও ২০টি সেতু-কালভার্ট এবং পেকুয়ায় ২৩০ কিলোমিটার সড়ক ও দুটি সেতু-কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার সদরে ২০ কিলোমিটার, রামুতে ৫০ কিলোমিটার, কুতুবদিয়ায় ৯ কিলোমিটার, উখিয়ায় ৬ কিলোমিটার, টেকনাফে ৫ কিলোমিটার এবং ঈদগাঁওয়ে ৫ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেতু ও কালভার্টের মধ্যে টেকনাফে ১৫টি, উখিয়ায় ১২টি, রামুতে ৫টি, কক্সবাজার সদরে ৪টি, পেকুয়া, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় দুটি করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে গ্রামীণ মেঠোপথ এবং গুরুত্বপূর্ণ সেতু-কালভার্ট ভেঙে যোগাযোগ ব্যবস্থা এক প্রকার লণ্ডভণ্ড। প্রাণহানি, বসতবাড়ি, মৎস্য খাত, কৃষি, সড়ক, বেড়িবাঁধে ভাঙনসহ ব্যাপক ক্ষতির চিত্র বেরিয়ে এসেছে। পাহাড়ধস ও বন্যাজনিত বিভিন্ন দুর্ঘটনায় ১৩ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একজন নিখোঁজ রয়েছেন। পানি যতই নেমে যাচ্ছে ততই ক্ষত স্পষ্ট হচ্ছে। আরো কয়েকদিনে পরিপূর্ণ ক্ষতি নিরূপণ সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে, ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নামা পাহাড়ি ঢলে ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৯টি এবং পাঁচটি পৌরসভার মধ্যে চারটি প্লাবিত হয়। এতে প্রায় ৪৯ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয় এবং অন্তত আড়াই লাখের অধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে দুর্ভোগে পড়েন।


প্রাথমিক প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পেকুয়া উপজেলার ৯৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। এরপর মাতামুহুরীতে ৮৫ শতাংশ, চকরিয়ায় ৮০ শতাংশ, কুতুবদিয়ায় ৬৫ শতাংশ এবং মহেশখালীতে ৫০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। রামু উপজেলার ৩৫ শতাংশ, কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার ২৫ শতাংশ করে এবং ঈদগাঁও উপজেলার ৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।


এদিকে, বন্যা-পরবর্তী এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বহুসংখ্যক টিউবওয়েল বন্যার পানিতে ডুবে থাকায় সুপেয় পানির সংকট তৈরী করেছে। ফলে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে শুকনো খাবার, পানি ও ওষুধ বিতরণ করা হলেও দুর্গম ও প্রত্যন্ত কিছু এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছেনি বলে অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা।


জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান জানান, দুর্যোগে জেলার ৪৫ হাজার ৪৩৬টি পরিবারের ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৯৮ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। মোট ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৩ জন রোহিঙ্গা ও ১৯ জন স্থানীয় বাসিন্দা। আহত হয়েছেন ২৪ জন। তাদের মধ্যে পাঁচজন রোহিঙ্গা ও ১৯ জন স্থানীয় বাসিন্দ।

আরও পড়ুন:  নোয়াখালীর উন্নয়ন-সমৃদ্ধি নিয়ে বৈঠক | Amar Bangla BANGLADESH


বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলায়। চকরিয়া উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ১১ হাজার ২৩১টি পরিবারের প্রায় ৭৫ হাজার ৫০০ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সেখানে সাতজন নিহত ও একজন আহত হয়েছেন। উপজেলায় ৯৫ মেট্রিক টন চাল ও ২০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।


পেকুয়া উপজেলার সাতটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার ৮ হাজার ৫৬২টি পরিবারের ৪৫ হাজার ৪৪৮ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সেখানে দুজন নিহত ও দুজন আহত হয়েছেন। উপজেলায় ৭৫মেট্রিক টন চাল এবং ১৫০প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।


কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৭ হাজার ৪২৭টি পরিবারের ২৯ হাজার ৭০৮ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সেখানে তিনজন নিহত ও একজন আহত হয়েছেন। উপজেলাটির জন্য ৩৫ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।


রামু উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের ৭ হাজার ৪৮৫টি পরিবারের ২৯ হাজার ৯৪২ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সেখানে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।


ঈদগাঁও উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ৮০০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। উপজেলাটির জন্য ১০মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।


মাতামুহুরী উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের ৭ হাজার ৯৮১টি পরিবারের ৪০ হাজার ২০০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সেখানে একজনের মৃত্যু হয়েছে। উপজেলাটির জন্য ৫০ মেট্রিক টন চাল ও ১০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।


কুতুবদিয়া উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের ১ হাজার ১২৫টি পরিবারের ৪ হাজার ৫০০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সেখানে একজনের মৃত্যু হয়েছে। উপজেলাটির জন্য ১০মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।


কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শহিদুল আলম বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলার ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা ছিল। জেলার বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।


নিহত ১৯জন স্থানীয় বাসিন্দার মধ্যে আটজনের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে মোট ২লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আহত ১৯ জন স্থানীয়ের মধ্যে তিনজনের পরিবারকে ১৫ হাজার টাকা করে মোট ৪৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।


এ কর্মকর্তা জানান, দুর্যোগ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ খোলা হয়। প্রতিটি উপজেলায় ইউনিয়নভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয় ট্যাগ কর্মকর্তা। জেলাজুড়ে ৮৮টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। সব উপজেলায় ২১৫টি অ্যান্টিভেনম ভ্যাকসিন বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া ৮ লাখ ২৫ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং ২ হাজার ৫০০টি জেরিক্যান বিতরণ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন:  কমেছে আদা, রসুন ও পেঁয়াজের দাম, মূল্য তালিকা টানানোর নির্দেশ বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রীর


জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, বন্যায় জেলার ৯টি উপজেলার ৬১টি ইউনিয়নে ৩ হাজার ৯১৮টি মৎস্য খামার ও ৪৫৩টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৩১৩ হেক্টর পুকুর এবং ২ হাজার ১২৭ হেক্টর মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে এক হাজার ৯৭ মেট্রিক টন সাদা মাছ, ৩৮৫ মেট্রিক টন চিংড়ি, ৩৫৬ মেট্রিক টন মাছের পোনা এবং ২ কোটি ২১ লাখ চিংড়ির পোনা নষ্ট হয়েছে। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ সাদা মাছে ১৯ কোটি ২৩ লাখ টাকা, চিংড়িতে ১২ কোটি ৬২ লাখ টাকা, মাছের পোনায় ৫ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং চিংড়ির পোনায় এক কোটি ৬০ লাখ টাকা।


কক্সবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলমান বন্যায় জেলার ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রায় ৪ হাজার ২১১ হেক্টর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গিয়ে ধান, শাকসবজিসহ বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়।


জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এএম খালেকুজ্জামান বলেন, বন্যায় ৩০৩টি খামারের ১ হাজার ২৯০টি গবাদিপশু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া ৩৩০টি পোলট্রি খামারের ৯৭ হাজার ৫৮১টি হাঁস-মুরগিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়, পানি উন্নয়ন বিভাগ-১ এর আওতাধীন ৩৮০ দশমিক ২৯৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে টানা বৃষ্টিতে বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় ৪৪টি স্থানে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।


পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বলেন, চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের পুরুত্যাখালী পূর্বপাড়া এলাকায় প্রায় ২৫ মিটার বেড়িবাঁধ ও একটি সেতুর অংশ ভেঙে গেছে। বৃষ্টি কমে গেছে, পরিস্থিতি আরেকটু স্বাভাবিক হলে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধগুলো দ্রুত মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।


তথ্য মতে, কক্সবাজারে মোট ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পেকুয়া ও কুতুবদিয়া উপজেলায়। এই দুই উপজেলায় ১৫টি করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্য উপজেলাগুলোতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতির কোনো তথ্য জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি।


জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, জেলার সব ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সরকারি সহায়তা ও ত্রাণ পৌঁছে দেয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি হয়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার পরিদর্শন করেছে ত্রাণ বিতরণে অংশ নিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। ক্ষত দেখে প্রয়োজন অনুযায়ী আরো ত্রাণ সহায়তা দেয়ার উদ্যোগ চলছে।


কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আবদুল হান্নান জানান, গত ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত টানা ৯ দিনে কক্সবাজারে মোট ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। সোমবার (১৩ জুলাই) সন্ধ্যা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে ৪ মিলিমিটার।

---Advertisement---

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment