গ্রিক সভ্যতায় গণতন্ত্র নামক যে শাসন-ব্যবস্থার গৌরবময় ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে তা প্রথমত বিকশিত হয়েছিল এথেন্স নগরীতে। পেরিক্লিস (৪৯৫-৪২৯ খ্রীস্টপূর্বাব্দ) ছিলেন প্রাচীন গ্রিসের তথা এথেন্সের স্বর্ণযুগের সবচাইতে সফল গণতান্ত্রিক নেতা। তার কাছে জ্ঞানী-গুণী মানুষের কদর যেমন ছিল, তার পাশাপাশি কিছু চাটুকার ও আদম বেপারীর আদরও কম ছিল না। আদম বেপারী আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করা হচ্ছে না। গণতন্ত্রে যোগ্যতার বাছ-বিচার ছাড়াই কেবলমাত্র দলভারী করা, মিছিল-মিটিং ও ভোটদানে উপযুক্ত লোকবল যোগান দাতাদেরকেও এক ধরনের আদম ব্যবসায়ী বলা চলে। পেরিক্লিসের সময় এরকম গড়পত্তা মানুষের বড় রকম একজন যোগানদাতা ছিলেন এনিটাস। কিছুটা মাথামোটা ও বেয়াদব কিসিমের এই তরুণ লোকটাও পেরিক্লিসের মতো বিজ্ঞ নেতার আমলে তারই তত্ত¡াবধানে পাতি নেতা বনে গিয়েছিলেন। পাতি নেতা হলে কি হবে, তারই রোষাণলে পরে গ্রিসের সেই সময়কার সবচেয়ে জ্ঞানী লোকটাকেই জীবন দিতে হয়েছে। এই জ্ঞানী লোকটি হচ্ছে সক্রেটিস। জ্ঞান-প্রেমিক নির্লোভ এবং এক ধরনের বিশেষ আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের কারণে সক্রেটিস ছিলেন তৎকালীন এথেন্সের জ্ঞান পিপাসু তরুণ সমাজের অত্যন্ত প্রিয়ভাজন প্রভাবশালী মানুষ। পেরিক্লিস এবং তার সুবিজ্ঞ সহধর্মিনী আসপাসিয়ারও অতি নিকটজন হয়ে উঠেছিলেন তিনি। অন্যদিকে এনিটাস ছিলেন বৈষয়িক লাভ লোকসান নিয়েই যাদের ভাবনা-চিন্তা এমন কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের ধূর্ত সংগঠক। ইউনিমন নামক একটি জনবহুল মহল্লায় ছিলো তার বসতবাড়ি। ভোগবাদী মানুষের সংখ্যা সব সমাজেই সাধারণত একটু বেশি থাকে। তার এলাকায়ও এ-ধরনের মানুষের কমতি ছিলো না। আর তারাই ছিল মূলত তার টার্গেট পিপল। তার এলাকার এ ধরনের সংখ্যাধিক্য মানুষকে পুঁজি করে ভোটের রাজনীতিতে এনিটাসের এগিয়ে চাওয়া অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিলো না। সক্রেটিসকে তিনি খামাখা সন্দেহের চোখে দেখতেন। যে ধরনের মানুষের কাছে সক্রেটিস প্রিয়ভাজন তারা নিছক সংখ্যা নয়, বরং কতিপয় জ্ঞানপিপাসু মানুষ; তাই তাদের পরিমাণ বা পরিসংখ্যান এনিটাসের নিছক ভোটার নির্ভর রাজনীতিতে যে তেমন কোনো প্রভাব পড়বে না, এটা বোঝার মতো মগজ এই আদম বেপারীর ছিলো না। তবে হ্যাঁ, নিছক সংখ্যাগরিষ্ঠের বাছ-বিচারহীন চাহিদা ও সস্তা জনপ্রিয়তার তাগিদে নৈতিকতা বিবর্জিত অসাধু ও অদূরদর্শী নীতির পক্ষেও যারা অবস্থান নিতে পারেÑ এমন সুবিধাবাদী সমাজপতি বকধার্মিক ও তথাকথিত নেতাদের নিকট সক্রেটিস মোটেই সুবিধাজনক ব্যক্তি ছিলেন না।
এনিটাস ছিলেন মেধাহীন স্বার্থপর দুষ্ট প্রকৃতির মানুষের প্রধানতম নেতা। তাই তিনি ন্যায়বিচার, সুনীতি ও জ্ঞাননির্ভর সমাজ গঠনের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রত্যক্ষ কারিগর সক্রেটিসকে সরিয়ে দিতে চেয়েছেন। কেবল এথেন্স বা গ্রিস থেকে নয়, একেবারে দুনিয়া থেকে। মেলিটাস নামক এক কবিকে দিয়ে, সক্রেটিসের বিরুদ্ধে কিছু মিথ্যা অভিযোগ তুলে একেবারে মামলা জুড়ে দিলেন তিনি। তৎকালীন এথেন্সের বিচারিক আদালতও ছিলো গণতান্ত্রিক অর্থাৎ ভোট নির্ভর। অনাকাক্সিক্ষত হলেও অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই আদম কারবারি এনিটাসের হাতে ছিল অধিক পরিমাণে ভোট-অস্ত্র। খুবই অল্প ভোটে সক্রেটিসের পক্ষ হেরে গেল। হেমলক পান করে মর্তলোক থেকে বিদায় নিতে হলো তাঁকে। তবে সক্রেটিসের নিকট এটাতে হারানোর কিছু ছিল না, কেননা তাঁর ভাবনায় মৃত্যু মানে ইহলোকের সংকীর্ণ জীবন থেকে মহাজীবনে গমন। আর পুণ্যবানদের জন্য সেটিই হচ্ছে আসল গন্তব্য। তিনি বলতেন, “কোন মানুষের কাছে সাধন করার মতো মহৎ যদি কিছু থেকে থাকে, তাহলে তাঁর কাছে প্রশ্ন জীবন কিংবা মৃত্যুর নয়; বরং ইহকালীন জীবনে আপন কর্ম সম্পাদনের ক্ষেত্রে সে কোন প্রকার অন্যায়-অবিচারের আশ্রয় নিলো কিনা, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।” তৎকালীন গ্রিসীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি বোধ হয় এই যে, তারা তার সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তানকে গণতন্ত্রের হাত দিয়েই হত্যা করেছে।
গণতন্ত্রের সূচনাপর্ব বলে সুনামধারী সেই সময়কার গ্রিক নগর রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের সকল উৎকর্ষের মধ্যেও যেসকল মৌলিক মন্দ দিক ছিলো তার মধ্যে অন্যতম ছিলো লোকবলহীন জ্ঞানবলধারী গুণীদের অবমূল্যায়নের আশঙ্কা। গণতন্ত্রে জ্ঞানী মানুষের কদর নেই, কদর থাকে গড়পরতা মানুষের। এখানে অংকের একটি ব্যাপার আছে, ভোটের অংক। নেতাদের কদরও এখানে সংখ্যাতাত্তি¡ক। বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ের নেতারা কে কত দক্ষ, বিজ্ঞ, ভালো মানুষ তার চাইতে বিবেচনার বিষয় হলো কার পিছনে কত মানুষ আছে; মানুষ মানেই ভোটার, আর ভোট মানেই গণতন্ত্রের, আর ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা অর্জনই হচ্ছে গণতন্ত্রের মূল গ্রন্থব্য।
একবিংশ শতাব্দীতে এসেও কোনো কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই ধরনের অনাকাক্সিক্ষত বিষয় পরিলক্ষিত হয়। দারিদ্র, ব্যাপক ধণবৈষম্য, নৈতিক মূল্যবোধসমৃদ্ধ শিক্ষার অভাব, অন্ধ-সা¤প্রদায়িকতা এই অশুভ সম্ভাবনাকে সাধারণত বাড়িয়ে তোলে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র ঐতিহাসিকভাবেই এই রোগে আক্রান্ত। এখানে ক্ষমতাসীন দল এমনকি ক্ষমতার বাইরে থাকা অধিকাংশ দলই তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চর্চার ক্ষেত্রে মুখ্যত জনবলকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। দলীয় পদ-পদবীকে ব্যক্তি-স্বার্থে গোষ্ঠী-স্বার্থে, ব্যবহার করার ফিন্দী-ফিকির জানেÑ তেমন কিছু তথাকথিত নেতা নানা রকম লোভ-লালসায় বেচাকিনি হয়Ñ এ ধরনের লোকদের নিয়ে দলবাজিতে অনেক সময় এগিয়ে থাকে। আর বাস্তবতা হচ্ছে, স্থানীয় পর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পর্যন্ত সংখ্যাতাত্তি¡ক হিসেবের উপরেই অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নেতৃত্ব ভাগাভাগি করে। এই অশুভ বাস্তবতার ফাঁদ থেকে মুক্ত হওয়ার আদর্শিক লড়াই চালিয়ে যাওয়া সকল শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষেরই দায়িত্ব। তবে বাংলাদেশের মতো কোনো ধনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাধারী দরিদ্র দেশে উদার মানবতাবাদী এবং সর্বজনীন কল্যাণকামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আদর্শে পরিচালিত এবং সত্যিকারের জ্ঞানভিত্তিক নেতৃত্ব দ্বারা পরিচালিত কোনো দলের পক্ষে ক্ষমতার মসনদে আসীন হওয়া অনেকটাই অসম্ভব বলা চলে। যতদিন পর্যন্ত দেশে প্রজ্ঞাবান, দক্ষ, নৈতিক নেতৃত্বের আধিক্য রাজনৈতিক দলগুলোতে দেখা না যাবে, ততদিন পর্যন্ত নিছক সাংবিধানিক শুদ্ধিতা, ভোটাভুটি আর ক্ষমতার পালাবদল দিয়ে সত্যিকারের কল্যাণ রাষ্ট্রের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে না।
লেখক: অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
Leave a Comment