কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং অটোমেশনভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থার দ্রুত বিস্তারে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। বিশেষ করে দেশের প্রধান রপ্তানিমুখী খাত তৈরি পোশাক শিল্পে আগামী বছরগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।
২০৪১ সালের মধ্যে ঝুঁকিতে ১২ লাখের বেশি শ্রমিক
সিপিডির প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সালের মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশই নারী শ্রমিক হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের শ্রমবাজার এবং সামাজিক কাঠামোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানোই বড় চ্যালেঞ্জ
‘পরিবর্তনশীল কর্মপরিবেশ: বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলে কর্মপরিবেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে দূরদৃষ্টি’ শীর্ষক এক ভার্চুয়াল ওয়েবিনারে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, শ্রমবাজারের চাহিদা দ্রুত বদলাচ্ছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং নীতিগত প্রস্তুতিতে এখনও বড় ঘাটতি রয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় অর্জিত দক্ষতা ও শিল্পখাতের বাস্তব চাহিদার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অমিল রয়েছে। বর্তমানে মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় (টিভিইটি) অংশগ্রহণ ২০ শতাংশেরও কম। অন্যদিকে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে সরকারি ব্যয় জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ।
এলডিসি উত্তরণ ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের নতুন চাপ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যখন স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখনই অটোমেশন, ডিজিটাল অর্থনীতি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থার পরিবর্তন শ্রমবাজারে নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।
গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে প্রায় ১৩ লাখ কর্মসংস্থান কমেছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই নারী কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
বিশ্বব্যাপীও বদলাচ্ছে কর্মসংস্থানের ধারা
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের পূর্বাভাসের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই ও অটোমেশনের ফলে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে। একই সময়ে প্রায় ৯০ লাখ প্রচলিত চাকরি বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। অর্থাৎ প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতাই ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
শ্রমবাজারে কোন ঘাটতির কথা বলছে সিপিডি
গবেষণায় চারটি বড় নীতিগত সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো—
প্ল্যাটফর্ম ও গিগ অর্থনীতির কর্মীদের জন্য সমন্বিত নীতিমালার অভাব।
অটোমেশনের প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে পর্যাপ্ত নীতি প্রণয়ন না হওয়া।
দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে শিল্পখাতের প্রকৃত চাহিদার প্রতিফলন কম থাকা।
অধিকাংশ পরিকল্পনার বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট রোডম্যাপের অনুপস্থিতি।
করণীয় কী?
চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সিপিডি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
শিল্পের চাহিদাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ।
শ্রমিকদের জন্য পুনঃদক্ষতা (রিস্কিলিং) কর্মসূচি চালু।
শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি।
জাতীয় শ্রমবাজার তথ্যব্যবস্থা (LMIS) গঠন।
প্ল্যাটফর্মভিত্তিক কর্মীদের সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
নারী, তরুণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান নীতি বাস্তবায়ন।
ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতির তাগিদ
সিপিডির মতে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সময় অতিক্রম করছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, কার্যকর নীতি বাস্তবায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থানে রূপ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।
আমার বাঙলা/ রাব্বি
Leave a Comment