রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না-পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ যখন ক্রমশ বাড়ছে, তখন পরিস্থিতি সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের পথে নবান্ন। আবেদন বাতিল হওয়া মহিলাদের জন্য খুব শীঘ্রই চালু হচ্ছে ‘এডিট’ অপশন। এর মাধ্যমে আবেদনকারীরা জানতে পারবেন কেন তাঁদের আবেদন খারিজ হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংশোধন করে ফের যাচাইয়ের সুযোগও পাবেন। প্রশাসনের আশা, এতে বিভ্রান্তি যেমন কমবে, তেমনই প্রকৃত যোগ্যরা দ্রুত প্রকল্পের সুবিধা পাবেন।
জেলায় জেলায় অন্নপূর্ণার অর্থ না-পাওয়া নিয়ে গত কয়েক দিনে একাধিক জায়গায় বিক্ষোভ দেখা গিয়েছে। কোথাও বিডিও অফিস ঘেরাও হয়েছে, কোথাও সরকারি কর্মীদের লক্ষ্য করে কাঁচা ডিম ছোড়ার ঘটনাও ঘটেছে। প্রকল্প থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ তুলে বহু মহিলা রাস্তায় নেমেছেন। এই পরিস্থিতিতেই নবান্ন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, যোগ্য কোনও আবেদনকারীকে বঞ্চিত করা হবে না।
প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও অন্নপূর্ণা যোজনা চালিয়ে যেতে সরকারের কোনও সমস্যা হবে না। প্রথম বাজেটেই এই প্রকল্পের জন্য ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি যোগ্য মহিলাদের প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বহাল রয়েছে।
আগের সরকার লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পে প্রায় ২ কোটি ২০ লক্ষ মহিলাকে ভাতা দিত। তবে বর্তমান সরকারের দাবি, তথ্য যাচাইয়ে দেখা গিয়েছে বহু অযোগ্য আবেদনকারীও সেই সুবিধা পেতেন। সরকারি কর্মী, আয়করদাতা কিংবা নির্ধারিত শর্ত পূরণ না-করা আবেদনকারীদের এবার অন্নপূর্ণার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিক হিসেবে প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ মহিলা এই প্রকল্পের আওতায় আসবেন বলে প্রশাসনের অনুমান।
হিসেব অনুযায়ী, প্রত্যেককে মাসে ৩ হাজার টাকা দিলে সরকারের মাসিক ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৫,১০০ কোটি টাকা। বছরে সেই অঙ্ক ৬১ হাজার কোটিরও বেশি। তবে বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, কেন্দ্র ও রাজ্যের সমন্বিত আর্থিক কাঠামোর কারণে এই ব্যয় বহনে কোনও সমস্যা হবে না।
সম্প্রতি মুখ্যসচিব মনোজকুমার অগ্রবাল জানিয়েছিলেন, অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য মোট ১ কোটি ৬২ লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে। তার মধ্যে প্রায় ১ কোটি ২২ লক্ষ আবেদন ইতিমধ্যেই অনুমোদিত হয়েছে। অন্যদিকে ২৭ লক্ষেরও বেশি আবেদন বাতিল হয়েছে। আগামী ১০ জুলাইয়ের মধ্যে সমস্ত বাতিল আবেদন পুনরায় যাচাইয়ের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নিয়েছে প্রশাসন।
এই পরিস্থিতিতেই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে পোর্টালে যুক্ত হচ্ছে ‘এডিট’ অপশন। যাঁদের আবেদন বাতিল হয়েছে, তাঁরা লগ ইন করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংশোধন করতে পারবেন। প্রথমবার আবেদন করার সময় কোনও ভুল তথ্য দেওয়া হয়ে থাকলে বা প্রয়োজনীয় নথিতে গরমিল থাকলে তা সংশোধনের সুযোগ মিলবে।
নবান্নের একাংশের বক্তব্য, অধিকাংশ আবেদন বাতিল হওয়ার পিছনে মূল সমস্যা আয়কর দেওয়া বা আর্থিক যোগ্যতা নয়। বরং আধার কার্ড ও মোবাইল নম্বরের অসঙ্গতিই সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু আবেদনকারীর আধারের সঙ্গে বর্তমান মোবাইল নম্বর যুক্ত নেই। আবার কেউ লক্ষ্মীর ভান্ডারের সময় এক নম্বর ব্যবহার করলেও এখন অন্য নম্বর ব্যবহার করছেন। এমনও দেখা গিয়েছে, একই মোবাইল নম্বর একাধিক সরকারি প্রকল্পে ব্যবহারের কারণে যাচাইয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনের দাবি, অনেক ক্ষেত্রেই আবেদন অনুমোদিত হলেও প্রযুক্তিগত কারণে অর্থ স্থানান্তর সম্ভব হয়নি। সেই সমস্যাও নতুন এডিট ব্যবস্থার মাধ্যমে দূর করা যাবে। আবেদনকারীরা নিজেরাই পোর্টালে দেখে নিতে পারবেন কোথায় সমস্যা রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে পারবেন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এবার থেকে আবেদন বাতিল হওয়ার কারণ আর অজানা থাকবে না। পোর্টালে লগ ইন করলেই আবেদনকারী জানতে পারবেন কেন তাঁর নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে এবং পুনরায় আবেদন কার্যকর করতে কী কী সংশোধন প্রয়োজন। প্রশাসনের আশা, এতে অন্নপূর্ণা যোজনা ঘিরে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি ও ক্ষোভ অনেকটাই কমবে এবং প্রকৃত যোগ্য মহিলাদের কাছে দ্রুত মাসিক আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
Leave a Comment