ন্যূনতম মজুরি মাসে ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে ঢাকা ও গাজীপুর। বুধবার সপ্তম দিনে গড়িয়েছে বিক্ষোভ। এদিন সাভার ও আশুলিয়ায় পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন শ্রমিকরা। ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ, পুলিশের গাড়িতে আগুন, কারখানায় ভাঙচুর, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। এর মধ্যেই আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষে গুরুতর আহত ১ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। মৃতের নাম তৌফিক শেখ (২১)। যদিও তাঁর মৃত্যুর কারণ নিয়ে পুলিশের সঙ্গে শ্রমিকদের বক্তব্যে বিরোধ দেখা দিয়েছে।
গাজীপুরের লায়লা গার্মেন্টসের কর্মী তৌফিক সোমবার শ্রমিক বিক্ষোভের সময় মোবাইল ফোনে একটি হামলার দৃশ্য রেকর্ড করার চেষ্টা করছিলেন বলে তাঁর আত্মীয়দের দাবি। সেই সময় কয়েকজন তাঁকে মারধর করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে ঢাকার উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। মঙ্গলবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
শ্রমিকদের অভিযোগ, পুলিশের লাঠিচার্জ এবং রাস্তায় ফেলে মারধরের জেরেই তৌফিকের এই পরিণতি। অন্যদিকে পুলিশের দাবি, বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের হামলায় আহত হয়েছিলেন তিনি। গাজীপুর পুলিশের এক কর্তার বক্তব্য, কারখানা বন্ধ করা নিয়ে বহিরাগতদের সঙ্গে শ্রমিকদের সংঘর্ষে ওই যুবক আহত হন। ঘটনার সময় সেখানে পুলিশ ছিল না বলেও দাবি পুলিশের।
বুধবার সকালে সাভারের হেমায়েতপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করেন কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। সকাল ৯টা নাগাদ শুরু হওয়া অবরোধের জেরে দীর্ঘক্ষণ যান চলাচল ব্যাহত হয়। পদ্মার মোড় এলাকায় পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা বিক্ষোভকারীদের সরানোর চেষ্টা করলে পুলিশ ও শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষ’ শুরু হয়। শ্রমিকদের একাংশ পুলিশের দিকে ইট-পাথর ছোড়েন। পাল্টা কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ে পুলিশ।
হেমায়েতপুর-সিঙ্গাইর সড়কে পুলিশের একটি গাড়িতেও আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। সংঘর্ষে পুলিশকর্মী, সাংবাদিক ও শ্রমিক-সহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে খবর। সকাল ১১টা নাগাদ অবরোধ তুলে দিলে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর ও নরসিংহপুর এলাকার একাধিক কারখানাতেও শ্রমিকরা কর্মবিরতি পালন করেন। পরে তাঁরা আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
বিকেলে সরকার মার্কেট এলাকার একটি পোশাক কারখানায় হেলমেট ও মুখোশ পরা একদল ব্যক্তি ঢুকে ভাঙচুর চালায়। সেই হামলায় ১ নিরাপত্তাকর্মী আহত হন। কারখানার সিসিটিভি ক্যামেরা, পরিবহণের ট্রাক ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষের দাবি। সাভার ও আশুলিয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে বিজিবির তিন প্লাটুন সদস্য মোতায়েন করা হয়।
এদিকে শ্রমিক অসন্তোষের জেরে গাজীপুরের ৫০টিরও বেশি পোশাক কারখানা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। কোনও কারখানায় এক দিনের, কোথাও দু’দিন বা তিন দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। সাভার ও আশুলিয়ার একাধিক কারখানাতেও ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, সাভার ও আশুলিয়া মিলিয়ে অন্তত ১৭৩টি কারখানার শ্রমিক এই আন্দোলনে অংশ নিচ্ছেন।
গত ১ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের মূল দাবি, ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা করা। শ্রমিকদের অভিযোগ, বর্তমান বেতনে মূল্যবৃদ্ধির বাজারে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁদের আরও দাবি, কালো তালিকা থেকে শ্রমিকদের নাম বাদ দিতে হবে এবং বিক্ষোভে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মুক্তি দিতে হবে। আন্দোলন থামাতে সরকার নতুন মজুরি নির্ধারণের বোর্ড গঠন করলেও বিক্ষোভ অব্যাহত।
আরও পড়ুন: মার্কিন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে ডেমোক্র্যাটরা, নির্বাচনী ফলকে স্বাগত ওবামার
এদিকে, আন্দোলনের পিছনে প্রাক্তন শাসক দল আওয়ামী লীগের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে বাংলাদেশের সরকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ-সহ একাধিক সরকারি কর্তা ও বিএনপি নেতার দাবি, শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে। পুলিশও আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে। তবে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবির পাশাপাশি আন্দোলনের পিছনে রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ কতটা সত্য, তা নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনও স্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি।
Leave a Comment