শরৎ এল রে: ‘সখীবেশ’-এ পুজো করেছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, জানেন কোন সেই পুজো?

By Suman Debnath

September 19, 2026 5:55 PM

শরৎ এল রে: ‘সখীবেশ’-এ পুজো করেছিলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, জানেন কোন সেই পুজো?


আগের জৌলুস বা জাঁকজমক এখন আর সেভাবে নেই। তবে আভিজাত্য  ও ঐতিহ্য রয়েছে অটুট। রানি রাসমণির  (Rani Rashmoni) পুজো তাঁর বংশধরদের মধ্যে দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেলেও তাঁর করা আদি পুজোটি (Durga Puja) আজও রয়েছে স্বমহিমায়। দক্ষিণেশ্বরের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর বাড়ির দুর্গাপুজো (Durga Puja) ছিল অভিজাতগন্ধী। জানবাজারের সাত মহলা বাড়ি ছিল তাঁর। আর তাতে ছিল তিনশোর মতো ঘর। ব্রিটিশ শাসিত পরীধান ভারতের বুকে শুরু হয়েছিল এই বাড়ির দুর্গাপুজো।

কথিত আছে দুর্গাপুজোর (Durga Puja) আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে গিয়ে ব্রিটিশ রাজের সঙ্গে মামলা মোকাদ্দমায় জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। এই বাড়িতে ষষ্ঠীর দিন কলাবৌকে গঙ্গাস্নান করানোর রীতি প্রচলিত ছিল। ঢাক-ঢোল বাজিয়ে কলাবৌকে স্নান করাতে নিয়ে যাওয়া হত। সেই ঢাক-ঢোলের আওয়াজে ভোরের কাঁচা ঘুম ভেঙে গিয়েছিল এক সাহেবের। তিনি রানির (Rani Rashmoni) বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেন। কিন্তু রানিও  (Rani Rashmoni)দমবার পাত্রী নন। পরের দিন আরও লোকলস্কর আর বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে রানি গঙ্গাস্নানে পাঠান বাড়ির মহিলাদের।

আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: বেলুড় মঠে দুর্গাপুজোর উদ্বোধন করেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ, আজও তাঁর ঐতিহ্য বহমান

তাতে আরও ক্ষুব্ধ হন সাহেব। পঞ্চাশ টাকা জরিমানাও হয়। এর প্রতিশোধ নিতে বাবুরোডের দু’পাশে বাঁশের খুঁটি পুঁতে গাড়ি-ঘোড়া যাওয়ার পথ আটকে দিয়েছিলেন রানি রাসমণি। লোকমুখে প্রবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল, ‘অষ্টঘোড়ার গাড়ি দৌড়োয় রানি রাসমণি/ রাস্তা বন্ধ কত্তে পাল্লে না কোম্পানি।‘ এই রকম আরও অনেক ঘটনা জড়িয়ে রয়েছে এই পুজোর সঙ্গে।

আরও পড়ুন:  প্রত্যেক স্কুলে এবার ‘হর ঘর বিমা’ কর্মসূচি, নয়া উদ্যোগ রাজ্য সরকারের

এই পুজো শুরু হয়েছিল ১৭৯৪ সালে। পুজোর সূচনা করেছিলেন রানির (Rani Rashmoni) শ্বশুরমশাই অর্থাৎ ব্যবসায়ী কৈবর্ত্য সম্প্রদায়ভুক্ত প্রীতিরাম মাড়। স্বামী রাজাচন্দ্রের মৃ্ত্যুর পর ১৮৩৭ সালে এই পুজোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন রানি। তাঁর আমলে পুজোয় জৌলুসের অভাব ছিল না। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামীজি, নেতাজি, বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়-সহ অনেক বরেণ্য ব্যক্তি এই পুজোয় এসেছিলেন। তবে এই পুজোর সঙ্গে ওতপ্রতোভাবে যাঁর নাম জড়িয়ে আছে, তিনি হলেন রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব।

দেবী দুর্গার (Durga Puja) সঙ্গে এখানে পঞ্চ মহাদেব, রঘুবীর, রামকৃষ্ণ এবং সারদাকে পুজো করা হয়। ১৮৬৪ সালে রামকৃষ্ণদেব এই পুজোতে এসেছিলেন। ‘সখীবেশ’ ধরে পুজো করেছিলেন তিনি। সন্ধ্যা আরতির সময়ে মা দুর্গাকে চামর দুলিয়ে বাতাস করেছিলেন। রানি রাসমণির জামাই মথুরবাবু ভেবেছিলেন, তাঁর স্ত্রী পাশে দাঁড়িয়ে কোনও নিমন্ত্রিত স্ত্রীলোক মা দুর্গাকে চামর দুলিয়ে বাতাস করছেন। পরে তিনি রানির কন্যা জগদম্বার কাছ থেকে আসল তথ্য জানতে পারেন।

আরও পড়ুন:  মুখ্যমন্ত্রীর জনতার দরবারে টুম্পা-মৌসুমী, কামদুনির বিচার নিয়ে কথা

আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: মান্দালায় জেলে বসে দুর্গাপুজো করেছিলেন সুভাসচন্দ্র বসু

স্বয়ং রামকৃষ্ণদেব ভাবাবস্থায় চামর হাতে মাকে বাতাস করেছিলেন। সেই থেকেই এই পুজোতে আজও ঠাকুরদালানে বাড়ির মহিলারা প্রতিমার বাম দিকে এবং পুরুষেরা ডান দিকে দাঁড়ান। আগে পশুবলি হলেও আজ অবশ্য সেই রীতি বিলুপ্ত। ১৯৯২ সালে এই প্রথা বন্ধ হয়ে যায়। তার বদলে চালকুমড়ো, আখ বলি দেওয়া শুরু হয়। তবে এই প্রাচীন পুজোয় রীতির কোনও খামতি নেই।

রানি রাসমণির (Rani Rashmoni) বাড়ির পুজো শুরু হয় প্রতিপদ থেকে। সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী তিনদিনই এখানে কুমারীপুজো হয়। মাকে এখানে অন্নভোগ দেওয়া হয় না। লুচি, মিষ্টি, বোঁদে ভোগ হিসেবে পরিবেশন করা হয়। মা দুর্গা এখানে তপ্ত কাঞ্চনবর্ণা। শোলার সাজে সেজে ওঠেন মা। দেবীর চালচিত্রেও থাকে বৈচিত্র্য। চণ্ডী ও পুরাণের নানা কাহিনি তাতে আঁকা থাকে। তিলোত্তমার বুকে তাই আজও এই পুজোর আলাদা মাহাত্ম্য রয়েছে। ইতিহাস এই পুজোর সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলে। এক বাঙালি নারীর ব্রিটিশ রক্তচক্ষু উপেক্ষার বার্তাও দেয় এই পুজো।

দেখুন:

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment