মেরি কমকে দেখেই বক্সার হওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু, ইতিহাস গড়ে ভাইরাল পাকিস্তানের ফাতিমা

By Suman Debnath

August 1, 2026 7:10 PM

মেরি কমকে দেখেই বক্সার হওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু, ইতিহাস গড়ে ভাইরাল পাকিস্তানের ফাতিমা


ভারতের কিংবদন্তি বক্সার মেরি কম যে শুধু এ দেশের নতুন প্রজন্মের বক্সারদেরই অনুপ্রাণিত করেননি, তাঁর প্রভাব পৌঁছে গিয়েছে সীমান্তের ওপারেও, তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ, ফাতিমা জাহরা।

মেরি কমের অনুপ্রেরণাতেই বক্সিং গ্লাভস হাতে তুলে নিয়েছিলেন পাকিস্তানের ফাতিমা। আর গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে ইতিহাস গড়ে এখন তিনিই কমনওয়েলথ গেমসে পাকিস্তানের প্রথম পদকজয়ী মহিলা বক্সার।

২২ বছরের ফাতিমা মহিলাদের ৬০ কেজি বিভাগে ব্রোঞ্জ জিতে পাকিস্তানের খেলাধুলার ইতিহাসে নিজের নাম লিখে রাখলেন। পদক জয়ের পর তাঁর একাধিক মন্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ঝড় তুলেছে। কারণ, নিজের সাফল্যের নেপথ্যে তিনি অকপটে কৃতিত্ব দিয়েছেন ভারতের ছ’বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন মেরি কমকে।

মেরি কমের সাফল্যই শুধু নয়, তাঁর জীবনসংগ্রামের গল্পও গভীরভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল ফাতিমাকে। মণিপুরের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া মেরি কম দারিদ্র্য, সামাজিক বাধা এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধাকে হার মানিয়ে বিশ্বের সর্বকালের অন্যতম সেরা বক্সার হয়ে ওঠেন।

বক্সিং জীবনের শুরুর দিকে পরিবারের অজান্তেই অনুশীলন করতেন তিনি। মাঠে কাজ করার পাশাপাশি নিয়মিত প্রশিক্ষণ চালিয়ে গিয়েছেন। পরে তিনি জিতেছেন ছ’টি বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ, অলিম্পিকের ব্রোঞ্জ, এশিয়ান গেমস ও কমনওয়েলথ গেমসের সোনা এবং পাঁচটি এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের খেতাব।

আরও পড়ুন:  লভলিনার আপত্তির জের, ভারতের ভুল মানচিত্র বিতর্কে ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টই মুছে ফেলল গ্লাসগোর রেস্তোরাঁ

২০১৪-য় মেরি কমের জীবনের উপর নির্মিত বলিউডের বায়োপিকটি ফাতিমার মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল। তখন তাঁর বয়স মাত্র ১০ বছর। ফাতিমা বলেন, ‘আমি ওঁর জীবনের উপর তৈরি সিনেমাটা বারবার দেখতাম। যখন বক্সিং শুরু করি, তখন সেই ছবিটা দেখে অনুশীলন করতাম। ওঁর প্রতি আমার ভীষণ শ্রদ্ধা রয়েছে। ইনশাল্লাহ, একদিন আমিও ওঁর মতো হতে চাই। আশা করি, কোনও একদিন ওঁর সঙ্গে আমার দেখা হবে’।

মেরি কমের মতো ফাতিমাকেও স্বপ্ন পূরণের জন্য পরিবারের আপত্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার পারিবারিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। আমার প্রথম কোচই আমাকে সবকিছু শিখিয়েছেন। আমার পরিবারের সদস্যরা প্রথমে বক্সিংয়ের বিরুদ্ধে ছিল। তারা আমাকে অনুশীলনে যেতে দিতে চাইত না। কিন্তু আমি ওদের সঙ্গে লড়াই করেছি এবং প্র্যাকটিস চালিয়ে গিয়েছি’। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বিরোধিতাই বদলে গিয়েছে নিঃশর্ত সমর্থনে। হাসিমুখে ফাতিমা জানান, ‘এখন আমার লড়াই বা প্রতিযোগিতা নিয়ে আমার থেকেও বেশি দুশ্চিন্তা করে পরিবারের সেই মানুষগুলোই’।

আরও পড়ুন:  ‘দেশের জার্সি পরলে ধর্ম নয়, পরিচয় একটাই ভারত’—সম্প্রীতির বার্তায় মুখ খুললেন মহম্মদ সামি

ফাতিমার আশা, তাঁর এই ঐতিহাসিক পদক পাকিস্তানের আরও বহু মেয়েকে সমাজের প্রচলিত ধ্যানধারণা ভেঙে খেলাধুলায় এগিয়ে আসার সাহস জোগাবে, যাতে তারা শুধু ঘরের কাজের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ না রাখে।

ফাতিমা বলেন, ‘আমিও একসময় সাধারণ একটি মেয়েই ছিলাম। বক্সিং শুরু করেছি, কঠোর পরিশ্রম করেছি এবং নিয়মিত অনুশীলন করেছি। যেসব মেয়েদের শুধু ঘরের কাজ করার কথা বলা হয়, আমি চাই তারাও আমার মতো বাইরে বেরিয়ে এসে নিজেদের স্বপ্নের পিছনে ছুটুক’।

তিনি আরও বলেন, ‘আমি অনেক সংগ্রাম করেছি, অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি। আমার পারফরম্যান্স দেখে অন্যরাও যেন আত্মবিশ্বাস পায়, অনুপ্রাণিত হয় এবং নিজেদের লক্ষ্য পূরণের সাহস খুঁজে পায়—সেটাই আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া’।

ভারত-পাকিস্তান রাজনৈতিক সম্পর্ক যতই তিক্ত হোক, খেলার দুনিয়ায় কোনো সীমান্ত নেই। ফাতিমার গল্প যেন সেই বার্তাই আরও একবার মনে করিয়ে দিল। যে মেরি কম একসময় ভারতের হয়ে বিশ্বজয় করেছিলেন, তাঁর পথ অনুসরণ করেই আজ পাকিস্তানের এক তরুণী দেশের মহিলা বক্সিংয়ে নতুন ইতিহাস লিখলেন।

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment