---Advertisement---

ডিপ স্টেট কী? কিভাবেই বা কাজ করে এরা?

By Suman Debnath

September 26, 2026 5:00 PM

ডিপ স্টেট কী? কিভাবেই বা কাজ করে এরা?

---Advertisement---


‘ডিপ স্টেট’ বা ‘গভীর রাষ্ট্র’ বলতে সাধারণত এমন একটি ধারণাকে বোঝানো হয়, যেখানে নির্বাচিত সরকারের পাশাপাশি রাষ্ট্রের কিছু শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আমলাতন্ত্র, নিরাপত্তা সংস্থা বা প্রভাবশালী গোষ্ঠী আড়ালে থেকে নীতি নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটে নির্বাচিত সরকারই চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী হলেও, তার বাইরে একটি স্থায়ী ও অদৃশ্য ক্ষমতার কাঠামো কাজ করছে—এমন ধারণাকেই ‘ডিপ স্টেট’ বলা হয়।

তবে ‘ডিপ স্টেট’ কোনও সর্বজনস্বীকৃত বা এককভাবে প্রমাণিত আন্তর্জাতিক সংগঠনের নাম নয়। বিভিন্ন দেশ ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শব্দটির অর্থও বদলে যায়। অনেক সময় রাজনৈতিক বক্তব্যে প্রতিপক্ষের গোপন আঁতাত বোঝাতেও শব্দটি ব্যবহার করা হয়।

কোথা থেকে এল ‘ডিপ স্টেট’ শব্দটি?

‘ডিপ স্টেট’-এর সঙ্গে তুরস্কের রাজনৈতিক ইতিহাসের সম্পর্ক রয়েছে। তুর্কি শব্দ ‘দেরিন দেভলেত’-এর অর্থ ‘গভীর রাষ্ট্র’। বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে তুরস্কে সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা, আমলাতন্ত্র এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মধ্যে গোপন যোগাযোগ ও ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছিল, সেই প্রেক্ষাপটে শব্দটি বিশেষ পরিচিতি পায়।

পরবর্তী সময়ে এই ধারণা তুরস্কের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে আমেরিকার রাজনীতিতে গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক কাঠামো এবং স্থায়ী আমলাতন্ত্রের প্রভাব বোঝাতেও ‘ডিপ স্টেট’ শব্দটি ব্যবহৃত হতে শুরু করে।

কীভাবে কাজ করে বলে মনে করা হয়?

‘ডিপ স্টেট’-এর কোনও নির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামো নেই। বরং এটি একটি ধারণা, যার মাধ্যমে রাষ্ট্রের দৃশ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে থাকা প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের কথা বলা হয়।

এই ধারণার প্রবক্তাদের মতে, প্রথমত, সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা চিন্তনকেন্দ্রের মাধ্যমে জনমতকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হতে পারে। নির্দিষ্ট কোনও নীতি বা সরকারের পক্ষে কিংবা বিপক্ষে জনমত তৈরিতে তথ্য, প্রচার এবং রাজনৈতিক বক্তব্যকে ব্যবহার করা হয় বলে তাঁদের দাবি।

দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক শক্তির কথাও উঠে আসে। বড় বিনিয়োগকারী গোষ্ঠী, কর্পোরেট সংস্থা, বিভিন্ন তহবিল বা বেসরকারি সংগঠনের অর্থনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে কোনও দেশের নীতি বা রাজনৈতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করার অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। তবে কোনও নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ‘ডিপ স্টেট’-এর অংশ হিসেবে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ জরুরি।

তৃতীয়ত, স্থায়ী আমলাতন্ত্র, নিরাপত্তা সংস্থা এবং সামরিক কাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের বিষয়টিও এই তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্বাচিত সরকার বদলালেও এই প্রতিষ্ঠানগুলির কাঠামো ও নীতির ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। সেখান থেকেই নির্বাচিত নেতৃত্বের বাইরে একটি ‘স্থায়ী ক্ষমতা কাঠামো’ থাকার ধারণা তৈরি হয়।

কারা থাকতে পারে এই কাঠামোর নেপথ্যে?

‘ডিপ স্টেট’-এর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনও সদস্য তালিকা নেই। বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণে আমলাতন্ত্র, গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থা, সামরিক-শিল্পক্ষেত্র, বড় কর্পোরেট গোষ্ঠী এবং প্রভাবশালী অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হয়।

তবে সিআইএ, বিশ্বব্যাঙ্ক বা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতো কোনও নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সামগ্রিক ভাবে ‘ডিপ স্টেট’-এর অংশ বলা একটি রাজনৈতিক দাবি হতে পারে; তা প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে গ্রহণ করার আগে প্রমাণ যাচাই করা প্রয়োজন।

ভারতীয় রাজনীতিতে ‘ডিপ স্টেট’ বিতর্ক

ভারতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক বিতর্কে ‘ডিপ স্টেট’, বিদেশি হস্তক্ষেপ এবং ‘হাইব্রিড যুদ্ধ’-এর মতো শব্দ ব্যবহার করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, রাজনৈতিক অস্থিরতা কিংবা কোনও নির্দিষ্ট প্রচারের পিছনে বিদেশি শক্তি বা গোপন নেটওয়ার্ক কাজ করছে—এমন অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে।

তবে এই ধরনের দাবির ক্ষেত্রে অভিযোগ, রাজনৈতিক ব্যাখ্যা এবং প্রমাণিত তথ্য—এই তিনটির মধ্যে পার্থক্য করা জরুরি। কোনও আন্দোলন বা রাজনৈতিক প্রচারের পিছনে বিদেশি শক্তির ভূমিকা রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করতে নির্দিষ্ট নথি, অর্থের উৎস, যোগাযোগের প্রমাণ এবং স্বাধীন তদন্তের ফল প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে ‘ডিপ স্টেট’ মূলত ক্ষমতার আড়াল-রাজনীতি বোঝাতে ব্যবহৃত একটি রাজনৈতিক ধারণা। কোথাও এটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে থাকা বাস্তব ক্ষমতাকেন্দ্রের বিশ্লেষণ, আবার কোথাও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের ব্যাখ্যা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। তাই ‘ডিপ স্টেট’ নিয়ে আলোচনা করতে হলে দাবি এবং প্রমাণের সীমারেখা স্পষ্ট রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

---Advertisement---

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment