হাইওয়েতে টোটোর চলাচল থেকে সরকারি বাসের ঘাটতি, সড়ক নিরাপত্তা থেকে কলকাতার ট্রাম—রাজ্যের পরিবহণ ব্যবস্থাকে ঘিরে একাধিক বিষয়ে নিজের পরিকল্পনা ও অবস্থান জানালেন পরিবহণ মন্ত্রী অর্জুন সিং। দৈনিক স্টেটসম্যান-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, শুধু নতুন যান রাস্তায় নামানো নয়, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে গোটা গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও নিরাপদ, সহজ এবং মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসাই লক্ষ্য। একই সঙ্গে পরিবহণ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়িয়ে রাজ্যের যুবকদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির কথাও জানান তিনি। হাইওয়েতে টোটোর চলাচল নিয়ে অর্জুনের অবস্থান যথেষ্ট কড়া। তাঁর বক্তব্য, অটোর অন্তত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র রয়েছে, কিন্তু টোটোর ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নেই। তাঁর কথায়, ‘অটোর তো তাও কাগজ আছে। টোটোর কোনও মা-বাবা নেই। পার্টি অফিস থেকে রেজিস্ট্রেশন হত।’ হাইওয়ে থেকে টোটো সরানোর জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
পরিবহণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের প্রসঙ্গে অর্জুন জানান, সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই একাধিক পদক্ষেপের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ধাপে ধাপে নতুন ও পরিবেশবান্ধব বাস রাস্তায় নামানোর পাশাপাশি ডিজিটাল টিকিটিং, একক স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের গণপরিবহণ ব্যবহারের সুবিধা, বাস ও ট্রামের রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং এবং টার্মিনাস ও ডিপোগুলির পরিকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। ইলেকট্রিক বাসের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি ট্যাক্সি পরিষেবাকেও প্রযুক্তিনির্ভর করার কথা ভাবা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
গণপরিবহণে স্মার্ট কার্ড ব্যবস্থার উপরও জোর দিচ্ছেন অর্জুন। দেশের অন্যান্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গেও খুব শীঘ্রই এই ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। বাসে যাতায়াতকারী মহিলাদের জন্য ‘পিঙ্ক কার্ড’ চালুর কথাও বলেন তিনি। পাশাপাশি একটি প্রযুক্তিনির্ভর মোবাইল অ্যাপ চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে, যার মাধ্যমে যাত্রীরা বাসের রিয়েল-টাইম অবস্থান, নির্দিষ্ট গন্তব্যে বাস পৌঁছতে কতটা সময় লাগবে এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য জানতে পারবেন। সাধারণ মানুষের অভিযোগ ও পরিষেবা সংক্রান্ত সমস্যার দ্রুত সমাধানের জন্য একটি বিশেষ হেল্পলাইন নম্বর চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান তিনি। সরকারি বাস পরিষেবা নিয়েও একাধিক পরিকল্পনার কথা জানান পরিবহণমন্ত্রী। তাঁর দাবি, কেন্দ্র সরকারের দেওয়া ৭০০-র বেশি বাস বর্তমানে বিভিন্ন ডিপোতে পড়ে নষ্ট হচ্ছে। প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে সেগুলিকে ধাপে ধাপে ফের পরিষেবায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি পুজোর আগে ৫০০টি এবং আগামী মার্চের আগে আরও ১০০০টি নতুন সরকারি বাস রাস্তায় নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, আগামী দিনে আধুনিক বাস পরিষেবার পাশাপাশি ট্রামকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।
পরিবহণ দপ্তরের পরিকাঠামো নিয়েও নিজের অসন্তোষের কথা গোপন করেননি অর্জুন। বেলতলায় অবস্থিত পরিবহণ দপ্তরের অফিসের প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য, ‘ওটা এখন ঘুঘুর বাসায় পরিণত হয়েছে।’ দপ্তরে নিরাপত্তা ও নজরদারি বাড়াতে পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা এবং আলোর ব্যবস্থা করার কথা জানান তিনি। পরিস্থিতির প্রয়োজন হলে দপ্তর অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হতে পারে বলে জানান।
সড়ক নিরাপত্তা প্রসঙ্গে অর্জুনের বক্তব্য, দুর্ঘটনা কমাতে ইতিমধ্যেই কোটি কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। রোড সেফটি নিয়ে নানা পরিকল্পনা থাকলেও দুর্ঘটনার সংখ্যা কমছে না। তাই প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি মানুষের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করেন তিনি। বাড়ির অভিভাবকদেরও সন্তানদের বিষয়ে আরও নিয়ন্ত্রণ রাখা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন পরিবহণমন্ত্রী। কলকাতার পর্যটনের সঙ্গে পরিবহণকে যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে। লন্ডনের ধাঁচে শীতের সময়ে ডবল ডেকার বাস চালানোর বিষয়ে আলোচনা যথেষ্ট ইতিবাচক হয়েছে বলে জানান অর্জুন।
আরজি করের অভয়া-কাণ্ডের দু’বছর পূর্তির প্রসঙ্গও ওঠে। পরিবারের তরফে নির্মল ঘোষের গ্রেফতারির দাবি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে অর্জুন বলেন, ‘নির্মল ঘোষ, চেয়ারম্যান গ্রেফতার হবে। অপেক্ষা করুন।’ শেষে পরিবহণের বাইরেও রাজ্যের শিল্প ও কর্মসংস্থান নিয়ে পরিকল্পনার কথা বলেন অর্জুন। তাঁর দাবি, রাজ্যে বন্ধ হয়ে থাকা আরও কারখানা খোলার পরিকল্পনা নিয়েও কাজ চলছে। পরিবহণ ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি শিল্পক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে রাজ্যের যুবকদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করাই লক্ষ্য বলে জানান তিনি।
Leave a Comment