শরৎ এর রে: কংস নারায়ণের হাত ধরেই সর্বজনীন দুর্গাপুজোর শুরু, তাঁর নামে মূর্তি তৈরির রীতি চালু হয়

By Suman Debnath

October 5, 2026 11:30 AM

শরৎ এর রে: কংস নারায়ণের হাত ধরেই সর্বজনীন দুর্গাপুজোর শুরু, তাঁর নামে মূর্তি তৈরির রীতি চালু হয়


বাংলায় দুর্গা প্রতিমা (Durga Puja) তৈরি করার দুটো প্রাচীন রীতি প্রচলিত রয়েছে। একটি হল ‘বিষ্ণুপুর রীতির প্রতিমা’ অন্যটি হল ‘কংস নারায়ণ রীতির প্রতিমা’। কম-বেশি এই দুই রীতি মেনেই প্রতিমা তৈরি হয়।

পাথরের মূর্তির পরিবর্তে কাদা-মাটি দিয়ে মূর্তি নির্মাণের রীতি আজ থেকে প্রায় এক হাজার পূর্বে শুরু হয়েছিল। বাংলার প্রতিমা শিল্পে কাদা-মাটি ব্যবহারের পথিকৃৎ হলেন বাংলার দুই রাজা। একজন হলেন পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের মল্লরাজা জগৎমল্ল। অপরজন হলেন পূর্ববঙ্গের ( বর্তমানে বাংলাদেশ) রাজশাহীর তাহেরপুরের রাজা কংস নারায়ণ। তাঁরা দু’জনেই দুটি ভিন্ন রীতির প্রতিমা নির্মাণ কৌশল সৃষ্টি করেছিলেন।

রাজা জগৎমল্ল সর্বপ্রথম ‘বিষ্ণুপুর রীতির প্রতিমা’ তৈরির সূচনা করেন। সময়টা ৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দ। নিজ মন্দিরের জন্য তিনি প্রতিমা নির্মাণ করিয়েছিলেন। সেই সময়ই প্রথম এই রীতি প্রয়োগ করা হয়। তারপর থেকেই ‘বিষ্ণুপুর রীতির প্রতিমা’র প্রচলন শুরু হয়। বর্তমানে বিষ্ণুপুর ছাড়া বাঁকুড়া জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা রাজবাড়িগুলিতে এই রীতি অনুসরণ করে প্রতিমা নির্মাণ করা হয়ে থাকে। তবে ‘কংস নারায়ণ রীতি’ অপেক্ষা এটি কম জনপ্রিয়।

আরও পড়ুন:  ৩৫ দিনেই ১৫০ পাতার চার্জশিট! তোলাবাজি-সিন্ডিকেট মামলায় দেবরাজকে দ্রুত বিচারের পথে রাজ্য

আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: প্যাঁচা কেন লক্ষ্মীর বাহন? আর রাজহাঁস সরস্বতীর?

শুধুমাত্র বাঁকুড়া জেলা ও রাঢ় বাংলার হাতে গোনা কিছু পরিবারে এই রীতি অনুসরণ করে মূর্তি তৈরি হয়। কাঠামোর উপরের দিকে থাকে গণেশ ও কার্তিক এবং নিচে থাকে লক্ষ্মী ও সরস্বতী। প্রতিমার পিছনে পটে আঁকা চালচিত্র থাকে না। তার পরিবর্তে মহাদেব তাঁর দুই অনুচর নন্দী ও ভিঙ্গির সঙ্গে কাঠামোর উপরে অবস্থান করেন। রাঢ় দেশের বহু জায়গায় দুর্গা প্রতিমার পরিবর্তে শুধু প্রতিমার মুখ থাকে।

রাজা কংস নারায়ণের বহুকাল আগে থেকেই বঙ্গদেশে দুর্গাপুজোর (Durga Puja) প্রচলন ছিল। তবে তাঁর হাত ধরে তা জনপ্রিয়তা পায়। ১৪৮০ খ্রিষ্টাব্দে মন্দির প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে সর্বজনীন দুর্গোৎসব আরম্ভ হয় তাঁর হাত ধরেই। সেই পুজোয় প্রায় ৮ লক্ষ টাকা তিনি ব্যয় করেছিলেন। যা বাঙালি সমাজে কিংবদন্তি তৈরি করেছিল। এরপর ‘কংস নারায়ণ রীতি’ সমগ্র বঙ্গদেশে ছড়িয়ে পড়ে। নদিয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র এই রীতিকে আরও জনপ্রিয় করে তোলেন।

আরও পড়ুন:  মুর্শিদাবাদ ট্রেন দুর্ঘটনায় কড়া বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর, ‘দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা’

আরও পড়ুন: শরৎ এল রে: ‘হুদুড় দুর্গা’, এক ভিন্ন দুর্গার কাহিনি

প্রতিমার চালির উপরের দিকে লক্ষ্মী ও সরস্বতী। গণেশ ও কার্তিক নিচে। প্রতিমার পশ্চাতে থাকে অর্ধচন্দ্রকার চালচিত্র। চালিতে দশমহাবিদ্যা ও মহাদেব আঁকা থাকে। এই ধরনের চালিকে ‘বাংলা চালি’ বলা হয়। প্রতিমার মুখের আদলে থাকে অভিনবত্ব। দেবীর টানাটানা চোখ ও টিয়া পাখির ঠোঁটের মতো বাঁকানো নাক। গাল সামান্য চাপা। এই ধরনের মুখের আদলের নাম ‘বাংলা মুখ’। প্রতিমার বর্ণ হয় গাঢ় হলুদ।

কৃষ্ণনগরের রাজবাড়ির প্রতিমা এই রীতিতে এখনও তৈরি হয়। পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ জমিদার ও রাজবাড়িগুলোর দুর্গা প্রতিমা এই ধ্রুপদী রীতি অনুসরণ করেই নিমার্ণ করা হয়ে থাকে। তবে সাবেকি রীতির প্রতিমায় স্থান ও সময়ভেদে পার্থক্য ঘটেছে। কিছু কিছু রাজবাড়িতে নিজস্ব রীতিও অনুসৃত হয়। ‘বাংলা চালি’র পরিবর্তে ‘মার্কিন চালি’ ব্যবহার করা হয়। ‘কংস নারায়ণ রীতি’তে ‘টানাচৌরি চালি’ ও ‘মঠচৌরি চালি’ও লক্ষ্য করা যায়।

দেখুন:

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment