এআইয়ের সাহায্যে গবেষণা, ফ্রান্সের সেরা সাহিত্য পুরস্কার জিতলেন ‘সেকেলে’ লেখক!

By Suman Debnath

November 5, 2026 5:45 PM

এআইয়ের সাহায্যে গবেষণা, ফ্রান্সের সেরা সাহিত্য পুরস্কার জিতলেন ‘সেকেলে’ লেখক!


পকেটে মোবাইল ফোন নেই। নিজেকে সাবেকি ঘরানার, এমনকি কিছুটা ‘সেকেলে’ লেখক বলতেই পছন্দ করেন তিনি। অথচ বই লেখার গবেষণায় ভরসা রেখেছেন আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপর। আর সেই কৃত্রিম মেধার সাহায্য নিয়েই ফ্রান্সের অন্যতম সম্মানজনক সাহিত্য পুরস্কার প্রিক্স গঁকুর জিতে নিলেন ৬২ বছরের লেখক ফিলিপ জায়েসাদা। তাঁর এই জয় ঘিরেই ফরাসি সাহিত্যজগতে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক।

তবে বিতর্কের কেন্দ্রে শুধু ফিলিপ নন, প্রশ্নের মুখে পুরস্কার প্রদানকারী বিচারকমণ্ডলীর অবস্থানও। কারণ, কয়েক দিন আগেই এআই ব্যবহারের অভিযোগে প্রিক্স গঁকুরের চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল হাইতিয়ান-কানাডিয়ান লেখক থেলিসন ওরেলিয়েনকে। তাঁর উপন্যাস ‘সিটেট সা ওউ মোরির’-এর ৯৫ শতাংশই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে লেখা বলে অভিযোগ উঠেছিল। এআই শনাক্তকরণ ব্যবস্থায় সেই ইঙ্গিত মেলার পরই তাঁকে প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

কিন্তু ফিলিপ জায়েসাদা নিজেই যখন তাঁর সদ্যপ্রকাশিত বইয়ের গবেষণায় চ্যাটজিপিটি এবং ক্লডের মতো এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা স্বীকার করছেন, তখন তাঁকে পুরস্কৃত করা হল কীভাবে? একজন লেখকের ক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের অভিযোগে বাদ পড়া, অন্যজনের ক্ষেত্রে সেই ব্যবহার স্বীকার করেও পুরস্কার জিতে নেওয়া—ফরাসি সাহিত্যজগতের এই দ্বিচারিতা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন।

অবশ্য সমালোচকদের অভিযোগের জবাবে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন ফিলিপ। তাঁর যুক্তি, একজন চলচ্চিত্র পরিচালক যেমন ছবিতে বিশেষ দৃশ্যপ্রভাব ব্যবহারের কথা গোপন করেন না, তেমনই লেখকও গবেষণার কাজে এআই ব্যবহারের কথা স্বীকার করতে পারেন। অর্থাৎ, তাঁর মতে, প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া মানেই লেখকের সৃজনশীলতার অবসান নয়।

আরও পড়ুন:  বঙ্গোপসাগরে নিম্নচাপের ভ্রুকুটি, সপ্তাহান্তেও রয়েছে বৃষ্টির পূর্বাভাস, উত্তর-দক্ষিণে কী পূর্বাভাস?

ফিলিপের পুরস্কারজয়ী উপন্যাসের নাম ‘ল’ইনকন্যু দু কুয়ে দে জ্যাভেল’। ১৯৪৯ সালে প্যারিসে লুইস ক্যানসট নামে ২৯ বছরের এক তরুণী মডেলের রহস্যমৃত্যুর ঘটনা ঘিরেই বইটির কাহিনি। শেন নদীর তীর থেকে উদ্ধার হয়েছিল ওই তরুণীর দেহ। পুরনো পুলিশি নথি এবং বিভিন্ন তথ্য ঘেঁটে সেই অমীমাংসিত খুনের তদন্তকে উপন্যাসের আকার দিয়েছেন লেখক। গোটা অনুসন্ধানের ধরনে রয়েছে জর্জেস সিমেননের বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র জুলস মেগ্রেটের তদন্তের ছায়া। আর সেই গবেষণার কাজেই এআইয়ের সাহায্য নিয়েছেন তিনি।

তবে ফিলিপের দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কখনও মানুষের আবেগ, স্মৃতি কিংবা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির বিকল্প হতে পারে না। তাঁর কথায়, মানুষের হৃদয়ের গভীরতা এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে যে সাহিত্য তৈরি হয়, তা কোনও যন্ত্রের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু তাঁর এই বক্তব্যের পরেও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—গবেষণা ও তথ্য সংগ্রহে এআইয়ের সাহায্য নিয়ে লেখা বই যদি দেশের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মান পেতে পারে, তা হলে এআই ব্যবহারের সীমারেখা ঠিক কোথায়?

বিতর্কের আঁচ পৌঁছেছে প্রিক্স গঁকুরের আয়োজক সংস্থার অন্দরেও। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিয়ম বদলের উদ্যোগ নিয়েছে অ্যাকাডেমি গঁকুর। সংস্থার সভাপতি ফিলিপ ক্লডেল জানিয়েছেন, চলতি বছরের শেষেই পুরস্কারের নিয়মে পরিবর্তন আনা হবে। নতুন নিয়মে স্পষ্ট করে দেওয়া হবে, এই সম্মান কেবল মানুষের লেখা বইয়ের জন্যই বরাদ্দ। অন্যদিকে প্রকাশনা সংস্থার প্রধান আন্তোইন গ্যালিমার্ডের বক্তব্য, লেখালেখির কাজে কেউ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করলে অন্তত তা প্রকাশ্যে স্বীকার করা উচিত।

আরও পড়ুন:  চোরবাগান কাণ্ডে এবার আতশকাচের নীচে খোদ পুলিশ, কাদেরকে ডাকবে লালবাজার?

এত বিতর্কের মধ্যেও অবশ্য জয় উদ্‌যাপনে কোনও খামতি নেই ফিলিপের। প্যারিসের বিখ্যাত রেস্তোরাঁ লে ড্রুয়ান্তের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তাঁর মুখে চওড়া হাসি। পুরস্কারের লড়াইয়ে তাঁর পক্ষে ভোট পড়েছে ছ’টি। প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ক্লেমেন্টিন মেলোইস এবং ইয়ানিক হ্যানেল। শেষ পর্যন্ত তাঁদের পিছনে ফেলে সেরার শিরোপা উঠেছে ফিলিপের হাতেই।

মজার বিষয়, এই সম্মানজনক পুরস্কারের আর্থিক মূল্য মাত্র ১০ ইউরো, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯০০ টাকা। কিন্তু পুরস্কারের প্রকৃত গুরুত্ব অর্থমূল্যে নয়, তার স্বীকৃতিতে। প্রিক্স গঁকুর জয়ের পর লেখকের বইয়ের বিক্রি এক ধাক্কায় অনেকটাই বেড়ে যায়। গত বছরের বিজয়ী লরেন্ট মাউভিগনিয়ারের বই বিক্রি হয়েছিল প্রায় ৬ লক্ষ ৪০ হাজার কপি। ফলে এ বার ফিলিপের বইয়ের বিক্রিও যে দ্রুত বাড়বে, তা বলাই বাহুল্য।

সাহিত্যে মানুষের সৃজনশীলতা বনাম যন্ত্রের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক চলতেই থাকবে। তবে আপাতত এক অদ্ভুত বাস্তবের মুখোমুখি সাহিত্যজগৎ। নিজেকে সেকেলে বলে পরিচয় দেওয়া এক লেখকের বইয়ের গবেষণায় আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবদান, আর তার জোরেই পকেট ভরার নতুন সম্ভাবনা!

 

Suman Debnath

Journalist

No comments to show.

Leave a Comment